পারিবারিক চুদাচুদির আসাধারন গল্প

সল্টলেকের অফিস থেকে বেরিয়ে অফিসের গাড়ী করে উল্টোডাঙ্গা স্টশনে পৌঁছোতে প্রায় ন টা বাজলো অরিত্রর। চারিদিকে লোকে লোকারন্য, দেড় ঘন্টা হয়ে গেছে নাকি কোনো আপ ট্রেন আসেনি। ডাউন ট্রেনের ও একই অবস্থা…এখানেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে শিয়ালদা স্টেশনে কি হতে পারে আর এর পরে যে ট্রেন আসবে তাতে কোনো মতেই যে ওঠা যাবেনা সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে শিয়ালদা চলে যাওয়া ভালো, কয়েক টা ট্রেন ছেড়ে তার পর না হয় ওঠা যাবে ভেবে স্টেশনের বাইরে এসে বাস ধরে শিয়ালদা পৌঁছে দেখলো একই অবস্থা, স্টেশনে ঢোকার মতো অবস্থা নেই। বাড়ীতে একটা ফোন করে জানিয়ে দেওয়া ভালো মনে করে পকেটে হাত দিয়ে দেখে মোবাইল টা নেই…এই নিয়ে পাঁচবার হল…কখন যে তুলে নেয় বোঝাই যায় না। যাক খুব একটা দামী ছিল না, আর একটা কিনে নেওয়া যাবে ভেবে বুথে গিয়ে ফোন করল, দিদান ফোন টা রিসিভ করলে মোটামুটি বুঝিয়ে বলে দিল…ট্রেনের গন্ডগোল আছে… দেরী হবে ফিরতে…তোমরা খেয়ে শুয়ে পড়, যা অবস্থা তাতে কত রাতে পৌঁছব, বলতে পারছি না। দিদান শুনে বলল…খুব অসুবিধা দেখলে ও যেন ভবানীপুরের বাড়ী চলে যায়। অরিত্র…কোনো দরকার নেই…আমি ঠিক চলে যাবো বলাতে দিদান বলল…আমি তোর দাদু কে বলছি নারায়ন কে খবর দিয়ে রাখতে, যত রাত হোক ও তোকে স্টেশন থেকে নিয়ে আসবে।

কি দরকার আবার বুড়ো মানুষটাকে বিব্রত করে, সারাদিন রিকশা টেনে একটু তো বিশ্রাম নিতে দাও, দাদু বললে তো আবারনা করতে পারবে না।

দিদান বললো…তোকে ওসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, তুই তো জানিস নারায়ন তোকে কত ভালোবাসে।
আরো ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করার পর জানা গেল কিছুক্ষনের মধ্যেই রানাঘাট লোকাল ছাড়বে, আরো দু একটা ট্রেন না ছাড়লে গিয়ে লাভ নেই দেখে চা খেয়ে আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর মনে হল ভীড়টা একটু হালকা হয়ে গেছে। গোটা তিনেক ট্রেন ছাড়ার পর, এবারে স্টেশনে ঢোকা যেতে পারে দেখে স্টেশনে ঢুকে প রের ট্রেন টাতে কোনো রকমে ধাক্কাধাক্কি করে একটা কামরায় উঠতে পারলেও ভেতরে যাবার কোনো উপায় নেই, অগত্যা একটু একটু করে দরজার পাশে যতটা যাওয়া যায় চেপে গিয়ে খুব কপাল ভালো পার্টিশান টায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াতে পারলো। একে ওই রকম ভীড় তার উপরে আবার কামরা টার বেশ কয়েক টা আলো জ্বলছে না। যে কটা জ্বলছে তার আলো ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেছে, বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পর একটু একটু করে ট্রেন এগোতে শুরু করল, যত টা না এগোয়,তার থেকে বেশী দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দমদম পৌঁছোল রাত প্রায় বারোটা, আধো আলো, আধো অন্ধকারে ঠিক মতো বোঝা না গেলেও খেয়াল করে দেখলো ওর বুকের উপরে মাথা রেখে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কি করবে, কিছু করার তো নেই ভেবে ওদিকে আর মন দিলো না, ট্রেনে ভীড় থাকলে হতেই পারে।ট্রেন টা ব্যারাকপুর ছাড়লো, ভীড়টা একটুও কমেনি। ট্রেন টা যেভাবে এগোচ্ছে, দুটোর আগে মনে হয় না বাড়ী পৌছোতে পারবে ভাবতে ভাবতে মেয়েটার খেয়াল করে দেখতে গিয়ে মনে হল, ঘুমিয়ে গেছে। এ কি রে বাবা, এতো ভীড়ে ঘুমোচ্ছে কি করে? ওর স্টেশন পেরিয়ে যায়নি তো ভেবে কাঁধে হাত দিয়ে একটু ঝাঁকিয়ে ডাকলো…এই যে শুনছেন…কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। পাশ থেকে একজন টিপুন্নি কাটলো…কি দরকার ডাকার, ঘুমোচ্ছে যখন ঘুমোতে দিন না, আর আপনার তো কোনো ক্ষতি দেখছি না।লোকটার কথা শুনে গা পিত্তি জ্বলে গেলেও জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকলো।পরের স্টেশনে ট্রেনটা দাঁড়াতেই বেশ কিছু প্যাসেঞ্জার নামতে শুরু করল ধাক্কাধাক্কি করতে করতে, মেয়েটা প্রায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছে দেখে কোনোরকমে হাত দিয়ে নিজের সাথে চেপে ধরে থেকে একটু একটু করে নিজের পাশে নিয়ে আসার চেষ্টা করে পার্টিশানের গায়ে নিয়ে এসে অনেকটা নিশ্চিন্ত হল। পাশ থেকে একজন বলল…এতো মনে হচ্ছে ঘুমোচ্ছে না, দেখুন আবার বেঁচে আছে কিনা…আজকাল কি যে হচ্ছেবোঝা খুব মুশকিল। লোকটার কথা শুনে একটা ঠান্ডা স্রোত শির দাঁড়া দিয়ে নেমে গেল, কোনোরকমে মেয়েটার একটা হাত ধরে বুঝলো…খুব আস্তে আস্তে পালস চলছে। যাক, বেঁচে আছে কিন্তুকি করা যায় ভাবছিল। দু এক জন বলল এক কাজ করুন স্টেশনে নেমে পুলিশের কাছে জমা করে দিয়ে আপনি আপনার মতো বাড়ী চলে যান। কোথাকার জল কোথায় গড়াবে কে জানে, কি দরকার বেশী ঝামেলায় যাবার।
পরের স্টেশনেই ওকে নামতে হবে, এই অবস্থায় অসহায় মেয়েটাকে এত রাতে এইভাবে ফেলে যাওয়া টা কেমন যেন অমানবিক মনে হল। আগে তো নামাই তারপরে দেখা যাবে ভেবে পাশের একজনকে অনুরোধ করল যদি একটু হেল্প করে নামাতে। হুড়োহুড়ি করে সবাই নেমে যাবার পর ধরাধরি করে কোনোরকমে নামিয়ে কপাল ভালো ছিল একটা বসার জায়গা পেয়ে ওখানে বসিয়ে দিয়ে একটু দম নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালো, ঘাড় কাত করে বসে আছে…মানে যেভাবে বসানো হয়েছিল সেই ভাবেই আছে। এদিক ওদিক তাকালো কাউকে যদি পাওয়া যায়, সবাই যেভাবে তাড়াতাড়ি করে চলে যাচ্ছে তাতে হেল্প করার কথা শুনলে হয়তো তেড়ে আসবে ভেবে আর সাহস হোল না। এতটা রাস্তা ওই ভীড়ে দাঁড়িয়ে আসতে হয়েছে, নিজের ই শরীরের অবস্থা খারাপ, ভীষন ক্লান্ত লাগছে…একটু বসে জিরিয়ে নি ভেবে মেয়েটার পাশে বসে পড়ল, এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল একটা জলের কল আছে, উঠে গিয়ে জল খেয়ে মাথায় ঘাড়ে জল দিয়ে একটু সুস্থ বোধ হলে ফিরে এসে বসে ভাবছিল…কি করবে…মেয়েটাকে ডাক্তার দেখানো দরকার মনে হচ্ছে, পুলিশের কাছে দিলে তো ফেলে রেখে দেবে অথবা একলা মেয়ে পেয়ে হয়তো আরো কিছু করতে পারে। হসপিটালে নিয়ে গেলেই ভালো ভেবে উঠে পড়ল কিন্তু কি করে স্টেশনের বাইরে নিয়ে যাবে ভাবতে ভাবতে নারায়ন দার কথা মনে পড়ল। দিদান তো বলেছিল নারায়ন দা অপেক্ষা করবে, কিন্তু নারায়ণ দা তো আর জানে না কোন ট্রেনে ফিরবে…হয়তো ওকে দেখতে না পেয়ে ভেবেছে পরের কোনো ট্রেনে আসবে আর তাই ভেবে অন্য কোনো প্যাসেঞ্জার নিয়ে চলে গেছে। ধুস, কি যে ঝামেলায় পড়লাম ভালোমানুষী করতে গিয়ে ভেবে নিজের উপরই রাগ হয়ে গেল। আরো কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকার পর মেয়েটার দিকে তাকালো… দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ ভালো বাড়ীর মেয়ে, মুখটা বেশ মিষ্টি…চেহারাতে বেশ একটা মাধুর্য আছে…দেখে মনে হচ্ছে না কুড়ি বাইশের বেশী বয়স হবে… একটু ঝাঁকিয়ে ডাকলো…কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না দেখে কি করবে ভাবতে ভাবতে দেখা যাক একাই নিয়ে যাওয়া যায় কিনা… দু হাতে করে তুলে নিয়ে দেখলো … নাঃ, খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না, জোরে পা চালিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে দেখলো একটাই রিকসা দাঁড়িয়ে আছে, যাক বাঁচা গেল, হসপিটালে নিয়ে যেতে পারবে ভেবে ওটার কাছে গিয়ে অনেক টা নিশ্চিন্ত বোধ করল… নারায়ন দার রিক্সা…বুড়ো মানুষটা পাদানিতে বসে ঢুলছে।
ও নারায়ন দা ওঠো…বলে জোরে ডাকতেই নারায়ন দা ধড়পড় করে উঠে পড়ে ওকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে উঠে বলল…আরে, এ আবারকে তোমার সাথে?

তুমি আগে একটু ধর, সিটে বসিয়ে দি…

দুজনে মিলে ধরাধরি করে কোনোরকমে সিটে বসিয়ে হুড টা উঠিয়ে দিয়ে ওতে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে নিজে উঠে মেয়েটাকে ধরে বসে বলল…নারায়ন দা…হসপিটালের দিকে চলো।

আগে তুমি বলোতো…কি ব্যাপার,মেয়েটা কে আর তোমার সাথেই বা কেন।

নারায়ন দা কে ও কখোনোই রিক্সাওয়ালা হিসেবে দেখেনি, কিছুটা গুরুজনের চোখে দেখে বলে… কিছু মনে না করে…সংক্ষেপে সব টা বললে নারায়ন দা বললো হসপিটালে তো নিয়ে যাবে বলছো কিন্তু এখন কি আর ডাক্তার পাবে, সরকারী হাসপাতাল, ওদের আর কি কোনো দায়িত্ব আছে…সারারাত ফেলেই রেখে দেবে। কাল রাতেই তো আমাদের পাড়ার একটা বৌ কে নিয়ে গিয়েছিলাম…বরটা মদ খেয়ে এসে বেদম মার মেরে নাক মুখ ফাটিয়ে দিয়েছিল দেখে নিয়ে গেলাম…ভর্তি করা তো দুরের কথা কেউ একবার দেখলো না পর্যন্ত…নাইট ডিউটির ডাক্তার নাকি এসে বেরিয়ে গেছে… জোরজার করাতে বলল…অন্য কোথাও নিয়ে যেতে। তার থেকে চলো…বাড়ী নিয়ে যাই, বোস ডাক্তার তো তোমার দাদুর বন্ধু, ওনাকে ডাকলে নিশ্চয় না করবেন না। তুমি দাদাভাই একটা কাজ কর বাড়ীতে একটা ফোন করে বল ডাক্তার বাবুকে খবর দিয়ে রাখতে, আমি তোমাদের কে নামিয়ে দিয়ে ওনাকে তুলে নিয়ে আসবো।

ফোন কি আর আছে, ভীড়ের মাঝে তুলে নিয়েছে।
চলো তাহলে আগে বাড়ীর দিকে যাই তারপর দেখা যাবে… বলে নারায়ন দা রিকশায় উঠে বাড়ির দিকে রওনা দিল। নারায়ন দা খুব সাবধানে চালালেও…মাঝে মাঝে রাস্তা খারাপ, তার উপর মেয়েটার জ্ঞান নেই…ধরে বসে থাকতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল দেখে কোলের উপরে ওর মাথা রেখে শুইয়ে নিতে হল। দিদান এত রাতে না ঘুমিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, মাঝে মাঝেই দেরী হয়…কিন্তু আজ যেন খুব বেশী দেরি হচ্ছে ছেলেটার…তার উপরে আবার ফোনটাও হারিয়ে বসে আছে… ওদের কে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিলে দুজনে মিলে ধরাধরি করে মেয়েটাকে বাড়ীর ভেতরে নিয়ে গিয়ে সোফাতে শুইয়ে দিল, ততক্ষনে দাদু ও উঠে এসেছে…ওদের কে ঘটনা টা বলতেই দাদু তাড়াতাড়ি করে বোস ডাক্তার কে ফোন করে মোটামুটিভাবে কি হয়েছে বুঝিয়ে দিয়ে আসার জন্য বলে দিলে নারায়ন বেরিয়ে গেল নিয়ে আসার জন্য।

অরিত্র একটু জল খেয়ে নিজেই কফি বানিয়ে নিয়ে এলো, একেই রাত হয়েছে… মেয়েটার জন্য খুব টেনশান হচ্ছে…খারাপ কিছু হয়ে না যায়। ওদিকে দাদু খুব অধৈর্য হয়ে ঘরের ভেতরে পায়চারি করছে মাঝে মাঝে বারান্দায় গিয়ে দেখে আসছে ডাক্তার এলো কিনা। দিদান আর শুক্লাদি দুজনে মিলে মেয়েটার চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে ভালো করে শুইয়ে দিয়ে জল খাওয়াবার চেষ্টা করছিল। ততক্ষনে ডাক্তার দাদু পৌছে গিয়েছেন… বেশ কিছুক্ষন দেখে একটা ইঞ্জেকশান দিয়ে দিলেন প্রথমেই… প্রেশক্রিপসান লিখে দিয়ে নিজেই ব্যাগ থেকে কিছু ওষুধ বের করে বললেন…এখুনি কিছু আনার দরকার নেই…এই ওষুধ গুলো কাল পর্যন্ত চলে যাবে…খুব একটা ভয়ের কিছু নেই, কয়েকদিন হয়তো খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করেনি বা টেনশান করে এই অবস্থা হয়েছে। মনে হচ্ছে বাড়ী থেকে পালিয়ে যাবার মতো কিছু ঘটনা থাকতে পারে। এখন কিছুটা গরম দুধ খাইয়ে দাও, আমি আরো কিছুক্ষন দেখে তারপর যাবো বলাতে শুক্লাদি তাড়াতাড়ি করে দুধ গরম করে নিয়ে এসে চামচে করে একটু একটু করে খাওয়াবার চেষ্টা করল…খুব বেশী না হলেও কিছুটা খাওয়ানো গেল। প্রায় এক ঘন্টা পর বোস দাদু আর একবার সবকিছু দেখে বললেন নাঃ…ঠিক ই আছে, পেশেন্ট রেসপন্স করছে… ভয় পাবার কিছু নেই, আমি কাল সকালে একবার এসে দেখে যাবো। কাল সকালে বরং পুলিশে একটা খবর দেওয়া ভালো… বলা তো যায়না… কোথা থেকে কি হয়ে যায়।
অরিত্রর স্নান করে অল্পছু খেয়ে নিতে নিতে রাত প্রায় চারটে বাজলো। মেয়েটাকে গেস্ট রুমে শুইয়ে দিয়ে ওখানেই শুক্লাদি বিছানা করে শুয়ে পড়েছে। প্রায় সারা রাত অনেক ধকল গেছে বলে সকাল সকাল ওকে আর কেউ ডাকেনি, প্রায় ন টা নাগাদ ঘুম ভাঙ্গার পর উঠে… আগে গিয়ে মেয়েটা কেমন আছে দেখতে গেলো। পাশ ফিরে শুয়ে আছে…মিষ্টি মুখটাতে ভীষন ক্লান্তির ছাপ…শুক্লাদি জানালো ভোরের দিকে একবার চোখ খুলে তাকিয়ে ছিল কিন্তু আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। একটু নিশ্চিন্ত বোধ করে হাত মুখ ধুয়ে চা এর কাপ টা নিয়ে দাদুর কাছে গিয়ে বসে বলল…কি করা যায় বলোতো? পুলিশ কেখবর দেওয়া উচিত মনে হচ্ছে?

দাদু একটু ভেবে বলল…এখন থাক,আগে সুস্থ হোক, নাম ঠিকানা নিয়ে তারপর যা করার করা যাবে। এই অবস্থায় পুলিশে টানা হেঁচড়া করবে…আমার ঠিক ভালো লাগছে না… আমি না হয় একবার তোর বিশ্বাস কাকুর সাথে কথা বলে রাখবো।

বিস্বাস কাকু আবার কে জিজ্ঞেস করাতে দাদু বলল… আরে তুই ভুলে গেলি…আমার বন্ধু সজল বিশ্বাসের ছেলে… বেঙ্গল পুলিশে কাজ করে, এখন কুচবিহারের কোথাও একটা পোস্টিং…খুব শিগরিই নাকি বিধাননগরে ট্রান্সফার হয়ে চলে আসছে। তোর পাসপোর্ট করানোর সময় অনেক হেল্প করেছিল।

ও আচ্ছা…হ্যাঁ…আমি আসলে খেয়াল করিনি…

তুই আজ অফিস যাবি নাকি?

নাঃ…ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি…যাবো না…

সেই ভালো…মেয়েটার যা অবস্থা…কিছু হলে…আমরা বুড়োবুড়ি সামলাতে পারবো না…

মনে হচ্ছে…আর বাড়াবাড়ি হবেনা…আর ডাক্তার দাদু তো বললোই ভয়ের কিছু নেই।

তা অবশ্য বলেছে… এক কাজ কর দাদুভাই…কিছু খেয়ে একবার গাড়ীটা নিয়ে ডাক্তার কে নিয়ে চলে আয়।

অরিত্র খেয়ে উঠে বেরোতে যাবে এমন সময় নারায়ন দা ডাক্তার বাবুকে নিয়ে এসে হাজির। শুধু নিজে আসেনি, সাথে করে আবার কিছু টাটকা ফল ও নিয়ে এসেছে। দিদান বকাবকি করাতে বলল…আরে নিয়ে এসেছি তো কি হয়েছে, মেয়েটাকে দেখে কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে। আমার নাতনি টা তো প্রায় ওর ই বয়সী। (ক্রমশ)
দুপুরের একটু আগে মেয়েটার ঘুম ভাঙ্গল… নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই… ভীষন দূর্বল…কিছুক্ষন শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর আর না পেরে চোখ বুজে ফেলল। দিদান আর শুক্লাদি দুজনে মিলে হালকা গরম জল দিয়ে হাতমুখ স্পঞ্জ করে দিয়ে কিছুটা গরম সুপ খাইয়ে ওষুধ খাওয়ানোর পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। পরেরদিন সকাল পর্যন্ত ওইভাবে মাঝে মাঝে চোখ মেলে তাকানো আর তারপরেই আবার ঘুমিয়ে পড়া চলল।দুপুরের পর থেকে মনে হচ্চিল যেন কিছুটা হলেও আগের থেকে ভালো… খুব সামান্য হলেও নড়াচড়া করতে পারছে… কিন্তু চোখের সেই শুন্য দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই।

পরের দিন বিকেল, মেয়েটি চোখ মেলে তাকালো… শরীরটা খুব ভারী লাগছে। বোঝার চেষ্টা করল… কোথায় আছে। কেমন যেন অচেনা লাগছে সবকিছু… কিছুই বুঝতে পারছে না… চিন্তা করতে গেলেই মাথার ভেতরে কেমন যেন একটা যন্ত্রনা শুরু হয়ে যাচ্ছে। চুপচাপ শুয়ে থাকলে বরং কষ্ট হচ্ছে না…মনে হল কেউ এসে যেন আদর মাখানো গলায় বলছে… এই তো ঘুম ভেঙ্গেছে…কেমন আছো? এখন একটু ভালো লাগছে?

মাথাটা আস্তে আস্তে কাত করে দেখলো… অচেনা কেউ এক মহিলা… সারা মুখে স্নেহ মাখানো…ওর দিকে তাকিয়ে আছে। জিজ্ঞেস করতে গেল…আমি কোথায়? ঠোঁট দুটো হয়তো একটু নড়ে উঠল কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না…আবার বলার চেষ্টা করলো… একই অবস্থা। ও যে চেষ্টা করছে কিছু বলার কিন্তু পারছে না… বুঝতে পেরে ওই মহিলা পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল… আচ্ছা…ঠিক আছে…থাক এখন কথা বলতে হবে না… শরীরটা এখোনো দূর্বল… আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। ওর দু চোখের কোন দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে জল বেরিয়ে আসতে শুরু করল… আমি কেন কথা বলতে পারছি না? আমি কোথায়? তুমি ই বা কে? আর তাকিয়ে থাকতে পারলো না…চোখ দুটো ভীষন ক্লান্তিতে বুজে এলো।
তারপর দিন সাতেক কেটে গেছে। মেয়েটা অনেক টাই সুস্থ হয়ে উঠেছে কিন্তু দুর্বলতা বেশ কিছুটা কমলেও পুরোপুরি কাটেনি,শুক্লা দি ওকে নিয়েই থাকে, স্নান করানো থেকে শুরু করে খাইয়ে দেওয়া সব কিছু নিজের হাতে সামলাচ্ছে। মুশকিল হয়েছে আজ পর্যন্ত একটা কথা বলেনি কিন্তু কিছু বললে বুঝতে পারে। প্রথম প্রথম নিজেকে খুব গুটিয়ে রেখেছিল কিন্তু আস্তে আস্তে অনেক টা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, দিদান আর শুক্লাদি কে খুব পছন্দ করে, মাঝে সাঝে অল্প হাসিও দেখা যাছে মুখে কিন্তু বেশির ভাগ সময় কেমন যেন একটা বিষন্ন ভাব…কিছু জিজ্ঞেস করলে ভাবলেষহীন মুখে তাকিয়ে থাকে… ডাক্তারদাদু বলেছেন…হয়তো খুব বড় কিছু শক পেয়ে কথা বন্ধ হয়ে গেছে…আবার বোবাও হতে পারে… আরো কিছুদিন না গেলে বোঝা যাবে না। অরিত্র দুবেলাই ওকে একবার করে দেখে যাওয়া ছাড়াও সারাদিনে অন্তত এক দুবার অফিস থেকে ফোন করে খোঁজ নেয় কেমন আছে।

আরো কয়েক টা দিন কেটে গেছে, এখন আর সেই দুর্বলতা নেই, মাঝে মাঝে ঘরের এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে বেড়ায়…কিছু যেন একটা বোঝার চেষ্টা করে। গেস্টরুম থেকে ওকে সরিয়ে এখন দোতলায় অরিত্রর পাশের ঘরটায় রাখা হয়েছে যতটা সম্ভব পাড়া প্রতিবেশীর চোখের আড়াল করতে, সাথে শুক্লাদিকেও ওর সাথে উপরের ঘরে থাকতে হচ্ছে । দিদান ওকে নিজের অনেক দুর সম্পর্কের নাতনী বলে পরিচয় দিয়ে পাড়া প্রতিবেশির কৌতুহল এড়িয়ে গেছে।

একটা সমস্যা তো ছিলই কথা না বলা, তার সাথে এখন যোগ হয়েছে…মাঝে মাঝে রাত্রে কিছু একটা হয়, ঘুমোতে ঘুমোতে হঠাত ভয় পেয়ে ভীষন ছটপট করে। শুক্লাদি উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক কষ্টে ওকে স্বাভাবিক করার পর শুক্লাদি কে জড়ীয়ে ধরে আবার ঘুমিয়ে পড়ে, এক সপ্তাহের ভেতরে দিন তিনেক এরকম হওয়ার পর থেকে এখন শুক্লাদি ওর সাথেই শোয়। ডাক্তার দাদু এখন অনেক টাই নিশ্চিত যে মেয়েটার জীবনে কোনো একটা খারাপ কিছু ঘটেছিল বা ঘটতে যাচ্ছিল যার জেরে মানসিক ধাক্কায় এই অবস্থা।মাঝে একদিন একজন ডাক্তার দাদুর চেনা শোনা একজন কে নিয়ে আসা হয়েছিল যিনি ডিফ এন্ড ডাম্ব স্কুলের শিক্ষক। ইশারায় ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে কোনো লাভ হয়নি, মাথা নেড়ে বুঝিয়েছিল ও কিছুই বুঝতে পারছে না, তার মানে ও বোবা নয়, আগে নিশ্চয় কথা বলতে পারতো, যদি তাই হোতো তাহলে ইশারায় কথা বলার ব্যাপার টা জানা থাকতো। মোটামুটি আরো কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে কলকাতার নাম করা একজন নিউরো আর সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানো হয়েছে। নানা রকম পরীক্ষা নিরিক্ষা করার পর ওনারা বলেছেন… দেখা যাক…এই ওষুধ গুলো খাওয়ান। কি হবে… না হবে… বলা মুশকিল। তবে দেখবেন কোনো রকম মানসিক চাপ যেন না পড়ে।
এর মধ্যে অবশ্য বিশ্বাস কাকুর সাহায্য নিয়ে লালবাজার আর ভবানী ভবনের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে কোলকাতা বা কোলকাতার বাইরে কোনো থানায় হারিয়ে যাবার ডায়েরী করা হয়েছে কিনা কিন্তু কোন লাভ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে খবরের কাগজে বা টিভি তে বিজ্ঞাপন দিয়ে ওর পরিচিত জনের খোঁজ করার চিন্তাও বাতিল করতে হয়েছে কারন যদি এটা হয় যে ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করা হয়েছিল আর তার জন্য ই ও কোনোরকমে পালিয়ে এসেছে…যারা ওর খোঁজ পেলে আবার ক্ষতি করতে পারে। এখন ওর থেকে কিছু জানার আগে আর কিছু করা উচিত হবে না ঠিক করে এটাও চেষ্টা করা হয়েছিল ওকে দিয়ে যদি লিখিয়ে জানা যায় ও কে। সে চেষ্টা ও বিফলে গেছে, কিছুই মনে করতে পারে নি…উলটে মনে করার চেষ্টা করতে গিয়ে যে কষ্ট পাচ্ছে সেটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল। ডাক্তার বাবুরা কোনো রকম মানসিক চাপ দিতে বারন করেছিলেন বলে খুব বেশী চেষ্টা ও করা যাচ্ছিল না। বিশ্বাস কাকুর ভরসায় পুলিশে খবর দেবার ব্যাপার টা নিয়ে এই মূর্হুতে তাই আর ভাবা হচ্ছিল না। তেমন কিছু যদি প্রয়োজন হয় তাহলে বলা যাবে যা কিছু করা হয়েছে তা নিতান্তই মানবিকতার কারনে…এর মধ্যে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই।

এক সাথেথাকতে থাকতে কবে যে মেয়েটা ওদের বাড়ীরই একজন হয়ে গেছে বোঝা যায়নি। কোন নাম নেই তাইদিদান ওর নাম রাখতে চেয়েছিল অনামিকা, যদি কোনোদিন ওর নিজের নাম জানা যায় সেদিন না হয়ওই নামে ডাকা যাবে কিন্তু এখন তো কিছু একটা বলে ডাকতে হবে। দাদু রাজী হয়নি, এত মিষ্টিমেয়ের নাম মধুমিতা ছাড়া আর কিছু নাকি হওয়া উচিত নয়…দুজনের কেউ কারুর কথা শুনতে রাজীনয়…শেষে অরিত্র র কথায় মৌ নাম রাখতে দুজনেই রাজী হয়েছে…কেউ ই নাতির কথা ফেলতে পারেনি।এখন মৌ বলে ডাকলে ও সাড়া দেয়, হয়তো বুঝেছে ওটাই ওর নাম।
কোনো এক রবিবার দুপুরে খাওয়ার পর অরিত্র ওর ঘরে প্রিয় কতগুলো রবীন্দ্র সংগীত চালিয়ে দিয়ে একটা গল্পের বই পড়ছিল। কি মনে করে দরজার দিকে তাকিয়ে মনে হল পর্দার ওদিকে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কে হতে পারে? দিদান বা শুক্লাদি হলে তো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে না আর ওদের তো এখন বিশ্রাম করার সময় ভেবে উঠে এসে দেখে মৌ চুপ করে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে, ঠোঁট দুটো অল্প অল্প নড়ছে, মনে হয় গানের কলি গুলো নিজেই গাওয়ার চেষ্টা করছে। অবাক হয়ে ওর এক মনে গান শোনা দেখে ভীষন ভালো লাগছিল ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে। গান টা শেষ হলে মৌ তাকিয়ে সামনে অরিত্র কে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে লজ্জায় মুখ নিচু করে নিলে অরিত্র ওকে ঘরের ভেতরে আসতে বলে পর্দা টা সরিয়ে দিল।ভেতরে আসতে চাইছিল না দেখে অরিত্র ওর হাত ধরে ভেতরে গিয়ে সোফাতে বসতে বলে একটু দুরে নিজেও বসে জিজ্ঞেস করল… তোমার গান শুনতে ভালো লাগছে?…তাই না? প্রথম প্রথম আপনি দিয়ে কথা বলতো …কিন্তু ওর যেন পছন্দ হয়নি…মাথা নেড়ে আপত্তি জানানোয় তুমি করে বলতে খুব খুশি হয়েছিল দেখে তারপর থেকে তুমি টাই চলছিল।

মুখ নিচু করে মাথা নেড়ে জানালো…হ্যাঁ…

ঠিক আছে…তুমি এখানে বসে শোনো…আমি ছাদে যাচ্ছি… বেশ কয়েকদিন গাছ গুলো কেমন আছে দেখা হয়নি…

মাথা নেড়ে জানালো…না…

কেন? এখন ইচ্ছে করছে না শুনতে?

হ্যাঁ…

তাহলে?

মৌ উঠে গিয়ে বিছানা থেকে বই টা হাতে নিয়ে দেখালো…অরিত্রর বই পড়া ছেড়ে ছাদে যেতে হবে না।

ও আচ্ছা…আমি ছাদে যাবো না…তাইতো?

একটা মিষ্টি হাসি মুখে নিয়ে ঘাড় নেড়ে জানালো…হ্যাঁ…তাই…

ঠিক আছে আমি যাবো না…তুমি এখানে বোসো…আমিও বসছি…আমার পরে পড়লেও হবে।
মৌ প্রায় দিন দুপুরে অরিত্রর ঘরে বসে নিচু আওয়াজে গান শোনে…অবশ্য রবিবার টা বাদ দিয়ে কারন ওই দিন অরিত্র বাড়ীতে থাকে। ও আসার পর থেকে বাড়ীর সবার ছকে বাঁধা জীবন টা যেন এক ধাক্কায় একেবারে পালটে গেছে। শুধু শুক্লাদি নয়, দিদান আর দাদু দুজনেরই অনেক টা সময় ওর সাথে কাটে…অনেকটা বন্ধুর মতো সম্পর্ক তৈরী হয়ে উঠেছে। কথা না বলতে পারা বা বয়সের একটা বিশাল ফারাক কোনো বাধা হতে পারেনি সেই সম্পর্কে। সবারই যেন কেমন মায়া পড়ে গেছে ওর উপরে। অরিত্রর অফিস বেরোবার সময়ে ও দিদানের সাথে থাকে,দিদান যখন রোজকার মতো সাবধানে যাবি, দেরী হলে জানিয়ে দিবি বলে, পাশে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে মৌ ওকে বিদায় জানায়। আজকাল অফিস বেরোবার সময়ে ওর ওই মিষ্টি হাসি টা দেখতে পাবে ভেবেই যেন অফিস বেরোতে ইচ্চে করে…অফিস থেকে ফিরতে কোনোদিন দেরী হলে খুব অস্থির হয়ে পড়ে, বারবার দিদানের কাছে গিয়ে জানার চেষ্টা করে কখন ফিরবে। বেশ কয়েকদিন দেরি করে ফেরার সময় রিকশা থেকে নেমে দেখেছে ওর ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে, ওকে দেখতে পেলেই তাড়াতাড়ি নেমে আসে নিচে, সারা মুখে একটু যেন বকুনি দেবার ইচ্ছে…কেন তুমি দেরী করলে? এর মাঝে আবার একদিন ট্রেনের গন্ডগোলে অনেক রাত হয়েছিল ফিরতে, বাড়ীতে ফোন করে জানাতে জানাতে অনেক টা দেরী হয়ে গিয়েছিল। দিদানের কাছে শুনলো…ও নাকি অরিত্রর ফোন আসার আগে দিদান কে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেছে…গলা দিয়ে আওয়াজ না বেরোলেও চোখের জল বুঝিয়ে দিয়েছে ও কতটা কষ্ট পেয়েছে। এই কিছুক্ষন আগে নাকি দিদান ওকে জোর করে শুতে পাঠিয়েছে না হলে সারাক্ষন নিচেই বসে ছিল। অরিত্র খেয়ে উপরে ওঠার সময় দেখলো মৌ ওর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে,সামনে গিয়ে দেরী হয়ে গেল বলাতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো…ওর যে ভীষন অভিমান হয়েছে বোঝাবার আর তো কোনো উপায় ছিল না। অরিত্র ওর হাত ধরে ঘরের ভেতরে গিয়ে বলল…সত্যি ভুল হয়ে গেছে…আর হবে না…এবার থেকে দেরী হলে আগেই জানিয়ে দেবো…কিছুতেই ওর দিকে তাকাচ্ছেনা দেখে অরিত্র ওর কাঁধে হাত রেখে নরম স্বরে বলল…এই…তাকাও আমার দিকে…। তাতেও তাকালো না দেখে ওর মুখ টা তুলে ধরে দেখলো…দু চোখে কান্নার আভাস। নিজের হাতে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল…এই…তাকাবে না আমার দিকে? আস্তে আস্তে চোখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো…খুব ইচ্ছে করছিলো ওকে বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল…এই তো আমি এসে গেছি…এখোনো…অভিমান করে থাকবে? ছোট্ট একটা নিস্বাস ফেলে কান্না ভরা চোখে নরম একটা হাসি মুখে নিয়ে বোঝালো…নাঃ…আমি আর অভিমান করে নেই…কিন্তু তুমি আর কখোনো আমাকে কষ্ট দেবে না। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছু না বলে…চোখের ভাষাতে হয়তো দুজনেই বুঝে নেবার চেষ্টা করছিল অন্যের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অজানা কথা গুলো। (ক্রমশ)
মৌ ফিরে গেছে নিজের ঘরে, রাত প্রায় দুটো বাজে, ঘুম আসছে না… মনের ভেতরে ভীষন ভালোলাগার একটা অনুভুতি… নিজের অজান্তে কবে যে ওর জন্য মনের ভেতরে একটা দুর্বলতা এসে গেছে বুঝতে পারেনি…এত দিনে হয়তো সত্যিকারের ভালোবাসা এলো জীবনে…ভালোলাগার সাথে সাথে কোথাও যেন একটা কিন্তুর ছোঁয়া…। বর্ষা চলে যাবার কথা থাকলেও…যাই যাই করেও মাঝে মাঝে থমকে গিয়ে ফিরে আসছে কয়েক দিন ধরে…খোলা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে কিছু হয়তো ভাবছিল… এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া এসে ঘরের ভেতরে হুটোপুটি করে গেল… দুরে কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেছে… জানলার পাশে হেলান দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অডিও সিস্টেমের দিকে চোখ পড়ল… S T A N D B Y… লেখাটা জ্বলছে নিভছে। মৌ হয়তো আজ গান শোনার পর বন্ধ করতে ভুলে গেছে, বন্ধ করে দি ভেবে এগিয়ে গিয়েও কি মনে করে রিমোটের পাওয়ার বাটন টা চাপলো… ডিসপ্লের উপর R E S U M E লেখাটা ভেসে উঠল…নিস্তব্ধ রাত… ঘরের মধ্যে 5:1 সিস্টেমে হাল্কা হলেও গমগমে আওয়াজ ভেসে এলো……
সখি ভাবনা কাহারে বলে… সখি যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বলো দিবস রজনী ভালোবাসা…ভালোবাসা
সখি ভালোবাসা কারে কয়? সেকি কেবলই যাতনাময়?
সে কি কেবলই চোখেরও জল?…সে কি কেবলই দুখেরও সাস?
লোকে তবে করে… কি সুখেরি তরে… এমন দুখেরও আস
আমার চোখে তো… সকলই শোভোন…সকলই নবীন… সকলই বিমল
সুনীল আকাশ, শ্যামল কানন…বিষদ জ্যোছনা কুসুম কোমল… সকলই আমারই মতো…
তারা কেবলই হাসে, কেবলই গায়, হাসিয়া, খেলিয়া মরিতে চায়
না জানে বেদন, না জানে রোদন, না জানে সাধের যাতনা যতন
ফুল সে হাসিতে হাসিতে ঝরে, জ্যোছনা হাসিয়া মিলায়ে যায়,
হাসিতে হাসিতে আলোক সাগরে আকাশের ও তারা তেয়াগে তায়…।
আমার মতো সুখি কে আছে? আয় সখি আয় আমার কাছে… সুখী হৃদয়ের সুখের গান… শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রান
প্রতিদিন যদি কান্দিবি কেবল
একদিন নয় হাসিবি তোরা
একদিন নয় বিষাদ ভুলিয়া
সকলে মিলিয়া গাহিবো মোরা…
ভাবনা কাহারে বলে? সখি যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বল দিবস রজনী ভালোবাসা…ভালোবাসা, সখি ভালোবাসা কারে কয়?… সেকি কেবলই যাতনাময়?
বারবার শুনেও যেন মন ভরছিলনা…ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কতবার যে গানটা শুনলো নিজেই জানে না… বুকের ভেতরে ব্যাথা ভরা আনন্দ নিয়ে কোল বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেনি।
পরের দিনটা ছিল রবিবার, অনেক রাতে শোবার জন্য স্বাভাবিক ভাবেই অরিত্র ঘুম থেকে উঠতে পারেনি সকাল সকাল, রবিবার সকালটা সাধারনত ওর দেরীই হয় উঠতে আর শুক্লাদির হাত থেকে চায়ের কাপ টা নিয়ে দিন শুরু করে। আজ, কাঁধের উপরে অন্য কারুর হাতের ছোঁয়া, ওকে ঘুম থেকে ওঠাবার চেষ্টা করছে…আস্তে আস্তে চোখ মেলে দেখল…খুব প্রিয় একজনের মিষ্টি হাসি মাখা মুখ…যার কথা ভাবতে ভাবতে কাল রাতে স্বপ্নের দেশে চলে গিয়েছিল…দু চোখে অদ্ভুত এক ভালোলাগার আবেশ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। বিছানায় উঠে বসে ওর হাত থেকে চায়ের কাপ টা নিয়ে জিজ্ঞেস করল…তুমি খেয়েছো?

মাথা নেড়ে জানালো…না…

খাবে না?

উত্তর টা… হ্যাঁ…বোঝার পর ওর আর বুঝতে অসুবিধা হোলো না কেন ও আগে খায়নি…তোমার চা নিয়ে এসো…এক সাথে খাবো আজ…বলাতে ফিরে যাচ্ছিল…শুক্লাদি চায়ের কাপ টা নিয়ে ঘরে ঢুকে বলল…থাক আর যেতে হবে না…এই নে। অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল…এবার থেকে আর দেরী করে উঠলে হবে না…তুই না ওঠা পর্যন্ত মেয়েটা কিছুতেই চা খেলো না আজ।

শুক্লাদির কথা টা শুনে ওর দিকে তাকালে লাজুক হাসি মুখে নিয়ে মুখ নামিয়ে নিল, যেন বলতে চাইছে…ইস… কি লজ্জা…সবাই বুঝে গেছে।

চা খেতে খেতে দুজনে দুজনের দিকে তাকাচ্ছিল অনেক টা চুরি করে, মাঝে মাঝে কেউ অন্যের কাছে ধরা পড়ে গিয়ে লাজুক হাসি হেসে বোঝাবার চেষ্টা করছিল শুধু আমি নই…তুমিও আমার দিকে তাকাচ্ছো চুরি করে। ওর দিকে তাকিয়ে মনে পড়ল…কয়েক দিন আগে দিদান বলেছিল…ছুটির দিন দেখে ওকে সাথে করে নিয়ে গিয়ে কিছু ভালো জামাকাপড় নিয়ে আসার ব্যাপারে…প্রথম দিনের তাড়াহুড়ো করে নিয়ে আসা সেই তিনটে আর ওর নিজের ওই দিনের পরে থাকা একটা…মোট চারটে সেট সালোয়ার কামিজ ছাড়া আর কিছু নেই…ওগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরে যেতে হচ্ছে। আজ বিকেলে তোমাকে নিয়ে বেরোবো বলাতে চোখ মুখ উজ্বল হয়েউঠল…জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অরিত্র হাসি মুখে বলল…উঁ হুঁ…এখন বলবো না…কোথায় যাবো…

মুখের ভাব পালটে যেন বলল…প্লিজ…বলোনা…

বলতেই হবে? জিজ্ঞেস করাতে হাসি মুখে ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল।

হুমম…আজ আমি তোমাকে নিয়ে কোথাও একটা যাবো…

নিজের দিকে আর অরিত্রর দিকেআঙ্গুল দেখিয়ে বোঝালো…শুধু তুমি আর আমি?

হ্যাঁ বলাতে…মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে যেন বলতে চাইলো…আমার ভীষন আনন্দ হচ্ছে…আজ আমি তোমার সাথে একা একা বেড়াতে যাবো।
দুটো নাগাদ মৌকে নিয়ে বেরোল,ব্যারাকপুরে গিয়ে কেনাকাটা করে ইচ্ছে আছে গান্ধীঘাটে কিছুটা সময় কাটিয়ে সন্ধের দিকে বাড়ী ফেরার। রবিবারের দুপুর…রাস্তা বেশ ফাঁকা…তবুও বেশ ধীরে সুস্থে ড্রাইভ করতে করতে এগোচ্ছিল…বাইরের হাওয়া খোলা জানলার ভেতরে দিয়ে ভেতরে এসে ওর রেশম কোমল চুলের সাথে দুষ্টুমি করে এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে…অবাধ্য চুল চোখ মুখের উপর থেকে সরাতে সরাতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে… সারা মুখে ভীষন খুশীর ছোঁয়া…ভাবখানা যেন…শুধু তুমি আর আমি…আর কেউ নেই কোথাও… মাঝে মাঝে ওর দিকে সকালের মতো চুরি করে তাকাতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে… চোখ পাকিয়ে যেন বলতে চাইছে…এই…এখন একদম আমার দিকে তাকাবে না… মন দিয়ে গাড়ী চালাও…কিছু হয়ে গেলে?

একটা মোটামুটি বড় দোকান দেখে ভেতরে গিয়ে দেখে যতটা খালি হবে ভেবেছিল এই দুপুরে ততটা নেই, বোধ হয় পূজো আর ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়ে গেছে। দোকান টা অনেক টা শপিং মলের মতো…এক এক জায়গায় এক একরকমের জামাকাপড় সাজানো আছে…নিজেই পছন্দ করে নেওয়া যাবে। মেয়েদের জামাকাপড়ের জায়গায় যেন আরো বেশী ভীড়, মৌ দোকানে ঢোকার আগে থেকেই ওর হাত টা শক্ত করে চেপে ধরেছিল…ভাবখানা যেন হাত ছেড়ে দিলেই ও হারিয়ে যেতে পারে। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে অরিত্র বললো…আমি কিন্তু মেয়েদের জামাকাপড়ের কিছুই বুঝি না…তোমাকেই দেখে নিতে হবে। ওর দিকে তাকিয়ে যেন বলতে চাইলো…তোমার যেটা ভালো লাগবে, সেটাই আমি নেবো। অরিত্র মনে মনে ভাবলো…জানি না কেন তুমি আমার উপরে এত নির্ভর করতে চাইছো…কেন এত কাছে আসতে চাইছো… এই কয়েকটা দিনের পরিচয়ে…জানিনা তুমি কে…তবুও তোমার কাছে আসতে মন চাইছে কিন্তু কি করে বোঝাই যে আমি ভীষন দুর্বল হয়ে পড়লেও এগোতে পারছি না… তোমার স্মৃতি ফিরে এলে তুমি কি আমাকে আর মনে রাখতে পারবে? বুকের ভেতরে নিজের কষ্ট চেপে রেখে হাসি মুখে বলল…আমাকে দেখে দিতে বলছো…তাই তো?

হাসি মুখে ঘাড় কাত করে জানালো…হ্যাঁ।

দুটো সালোয়ার সেট পছন্দ করার পর আর নিতে চাইছে না দেখে অনেক বোঝাতে হল যে…ইচ্ছে হলেই তো আর আসা যাবে না…তারপর পূজো আসছে…ওর কিছু ভালো জামাকাপড় লাগবেই…না হলে সাথে কি করে বেরোবে… বলাতে রাজী হল। বেশ কয়েক সেট দামী আর সব সময় বাড়ীতে পরার মতো জামা কাপড় নেওয়ার পর মনে পড়ল…আরে…ওর ভেতরে পরার যে কিছু নেওয়া হয়নি। জীবনে কোনোদিন ওসব কিনতে হয়নি…কি করা যায় ভাবতে ভাবতে ওকে নিয়ে এদিক ওদিক দেখে পেয়ে গেল কোথায় আছে। ভালোই হয়েছে সেলসগার্ল ও আছে…মৌকে নিয়ে এগিয়ে যেতে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল… ম্যাডাম…কি লাগবে। অরিত্র একটু অস্বস্তির সাথে মেয়েটাকে বলল…ও কথা বলতে পারে না…আমিও ঠিক বলতে পারবো না কি সাইজ লাগবে…আপনি যদি একটু দেখে কয়েকটা ভালো দেখে ওর কি লাগবে দিয়ে দিতে পারেন খুব ভালো হয়। মেয়েটা ওর কথা শুনে যেন কিছুটা অবাক হয়ে গেল… ঈশ্বর কেন এত নিষ্টুর… এত সুন্দর …এত মিষ্টি…অথচ কথা বলতে পারে না… নিজেকে সামলে নিল… সেলসগার্লদের কে যে মুখে হাসি রাখতে হবেই…তা সে মনে যতই কষ্ট থাকুক…ওকে আস্বস্ত করে বলল…ঠিক আছে…আপনাকে চিন্তা করতে হবে না…আপনি শুধু বলে দিন কটা করে দেবো।মৌ লাজুক মুখে পাশে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে বোঝাবার চেষ্টা করছিল…জানি আমার লাগবে কিন্তু তোমার সামনে কি করে নি বলোতো?

অরিত্র আস্তে করে ওকে বলল…তুমি দেখে নাও…আমি কাছেই আছি…তোমার হয়ে গেলে চলে আসবো।

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেও হাত ছাড়ছিল না দেখে অরিত্র হাসি মুখে বলল…হাত না ছাড়লে কি করে যাবো?
জামা কাপড়ের দোকান থেকে বেরিয়ে মৌ এর জন্য কিছু কসমেটিকস, ডিজাইনার অর্নামেন্টসআর জুতো কিনতে কিনতে প্রায় সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। গান্ধীঘাটে গিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে বাড়ী ফেরার পর ওর যেন আর দেরী সহ্য হচ্ছিল না দিদান আর শুক্লাদিকে কি কি কেনা হয়েছে দেখাতে। দিদান দের সব জিনিষ গুলোই খুব পছন্দ হয়েছে বলাতে ও ইশারা করে দেখালো যে ও নয়,সব কিছুই অরিত্র পছন্দ করেছে প্রথমে তারপর ও দেখেছে।
কয়েক দিন পর… অরিত্র অফিসের টেবিলে মোবাইল টা ভুল করে ফেলে রেখে দিয়ে লাঞ্চে চলে গিয়েছিল, ফিরে এসে দেখে দুটো মিসড কল। রুপসা মানে ওর জ়েঠুতুতো বোন বম্বে থেকে ফোন করেছিল। ছিঃ…আমি যে কি…নিজেই বুঝতে পারি না…কতদিন হয়ে গেছে একটা ফোনও করিনি…অনেক আগেই করা উচিত ছিল আমার…ভেবে কল ব্যাক করল। রুপসা রিং হতে না হতেই রিসিভ করে ওর স্বভাব মতো বকতে শুরু করল একনাগাড়ে…তোর ব্যাপারটা কিরে দাদাভাই…প্রেম ট্রেম করছিস নাকি আজকাল…কতদিন হয়ে গেল ফোন করিস না…ভুলে গেলি নাকি আমাদের…তোর অফিস কেমন চলছে… তুই কেমন আছিস…দাদু দিদান আর শুক্লা দি কেমন আছে…পুজোয় কি কলকাতায় থাকছিস নাকি কোথাও বেড়াতে যাচ্ছিস?…বুঝলি দাদাভাই…মায়ের সাথে আজ সকালে খুব ঝগড়া করেছি…ভালো লাগছিল না…ভাবলাম…দাদাভাই এর সাথে একটু কথা বলি…মনটা হালকা হবে…কিছু লাভ হোলো না…রিং হয়ে গেল…তুই ধরলিই না…

রুপসা যেই একবার থেমেছে অমনি সুযোগ পেয়ে অরিত্র বলল…তুই এবারে থামবি… নাকি ফোন টা কেটে দেবো? মিটিং আছে…আমার এখন মাথা খারাপ করার একেবারে ইচ্ছে নেই।

প্লি…জ দাদাভাই…কাটিস না…বিশ্বাস কর… তোর কথা খুব মনে পড়ছে আজ। প্লিজ আমার সাথে একটু কথা বল। মন টা খুব খারাপ রে…

আচ্ছা…ঠিক আছে…কাটছি না…আমি না হয় ব্যাস্ত ছিলাম কিছুদিন…ফোন করিনি…তুই ও তো করতে পারতিস…

দাদাভাই…কি বললি? তুই ব্যাস্ত ছিলিস? কি নিয়ে রে?

পরে শুনিস…বল…তোরা কেমন আছিস…

এই দাদাভাই…প্লিজ বল না…তুই তো কিছু লুকোস না আমার কাছে…কি এমন হয়েছে পরে বলতে চাইছিস?

মোটামুটি ছোটো করে মৌ এর ব্যাপারটা বলার পর কিছুক্ষন চুপ করে থেকে হৈ হৈ করে উঠল রুপসা…বলছিস কি রে দাদাভাই…এতবড় খবর টা তুই বেমালুম চেপে গেছিস আমার কাছে…তুই তো হিন্দি সিনেমা কে হার মানিয়ে দিয়েছিস রে একেবারে…তো…এবারে কি? I love u বলেছিস? নাকি…একেবারে সানাই বাজার পরে বলবি?

ধুস…তুই ও যেমন…সে রকম কিছু নয়…

এই দাদাভাই…কেমন দেখতে রে…আমার থেকেও ভালো নিশ্চয়?

কি করে বলবো…তোর থেকে ভালো কিনা…তুই ও কি কম কিছু নাকি? তবে ভালোই…

হুম…তুই যখন ভালো বলেছিস…তাহলে তো একঘর হবেই…

এই রুপসা…তুই তো ছোটো থেকে বম্বে তে বড় হয়েছিস…এসব কোলকাতাইয়া ভাষা কোত্থেকে শিখলি রে?

ওঃ দাদাভাই…তুই না কিছুই মনে রাখতে পারিস না…রায় আঙ্কল কে ভুলে গেছিস? খুব মজার মজার কথা বলে…

ও আচ্ছা…হ্যাঁ রে…একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। যাক গে… তোর কি খবর বল…

আমার আবার কি খবর থাকবে…চলছে…মাঝে মাঝে মায়ের সাথে লেগে যাচ্ছে…দুম দাম…ঢিস ঢাস…

কেন রে…কি হয়েছে?

আর বলিস না…মায়ের কোন বন্ধু নাকি দিল্লীর কে একটা ছেলের খোঁজ় দিয়েছে…very bright… passed fm IIM…Delhi…now in London…আমার সাথে বিয়ে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে…তুই বল দাদাভাই…আমি এখন বিয়ে করে কি করবো…সবে কেরিয়ার শুরু করতে যাচ্ছি…

হুম্…জেঠু কি বলছে?

বাবার কথা বলিস না…মায়ের কাছে মায়ের মতো…আর আমাকে বলছে…তুই তোর মতো থাক…ধুস আমার এক্কেবারে ভালো লাগছে না…ভাবছি…কদিন তোদের ওখান থেকে ঘুরে আসি…কতদিন দিদানের হাতের রান্না খাইনি…ছোড়দি ও বলছিল একবার যেতে…

খুব ভালো হবে রে…চলে আয়…

আমি তো না হয় যখন খুশী চলে যাবো…তুই ছুটি পাবি তো?

সে আমি ম্যানেজ করে নেবো…অনেকগুলো পিএল জমে আছে…অসুবিধা হবে না…

ঠিক আছে…বাবাকে ম্যানেজ করে তোকে জানিয়ে দেবো…খুব তাড়াতাড়িই যাবো…আমার কিন্তু খুব দেখতে ইচ্ছে করছে রে…

কাকে আবার দেখতে ইচ্ছে করছে?

ধ্যত তেরি কি…তুই একটা বুদ্ধির ঢেঁকি…কাকে আবার দেখতে ইচ্ছে করবে…তোর…ওকে…মানে আমার পেয়ারী পেয়ারী বৌদি কে…বুঝলি?

এই রুপসা…ভালো হচ্ছে না কিন্তু…আমার ও মানে কি রে? কি বললাম…আর কি মানে করে বসে আছিস…

আমি যাই একবার…তারপর দেখছি…তোর ও… নাকি অন্য কিছু।

ঠিক আছে…তুই আয়…গাট্টা না খেলে তুই বকতেই থাকবি…পাগলী কোথাকার। এই…রুপসা…শোন না…বড়দি কেমন আছে রে?

দিদির কথা আর বলিস না…কাজকাম কিসসু নাই…জাম্বুর পয়সায় এখান ওখান ঘুরছে…খাচ্ছে… আর দিনে দিনে ফুলছে।

তা ভালো…বাচ্চা টা কেমন হয়েছে…খুব দুষ্টু…তাই না?

দুষ্টু বলে দুষ্টূ…মায়ের কথায়…এক্কেবারে নাকি তোর ছোটোবেলার কার্বন কপি…এই দাদাভাই…এখন রাখছি রে…মনে হয় মা ফিরে এসেছে…হাসিখুশী দেখলেই আবার বিয়ের কথা শুরু করবে…চুপচাপ মুখ গোমড়া করে শুয়ে থাকলে এখন আর জ্বালাবে না…রাতে ফোন করবো…ধরিস কিন্তু…টা টা…

রুপসা ফোনটা কেটে দেবার পর কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকলো… মনের ভেতরে ছোটো বোনের ইয়ার্কি করে বলা… ‘তোর ও’… ‘আমার পেয়ারী পেয়ারী বৌদি’…কথাগুলো যেন বারে বারে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে…বুকের ভেতরের খুশী… সারা মুখে উজ্জল হাসি ছড়িয়ে দিয়েছে…সম্বিত ফিরে এলো… ওর জুনিয়ার… পিয়াল হাসিমুখে সামনে দাঁড়িয়ে… Sir…any good newz? Another promotion?

না না…তেমন কিছু না…এমনি…একটা কথা মনে পড়ে গেল… বলো… মিটিং আছে…তাই তো?

হ্যাঁ…খুব টেনশান হচ্ছে…প্রেজেন্টেশানটা একবার দেখে নিলে ভালো হয়।

Don’t worry… আমার দেখা আছে…u just need 2 present as I told…i think boss wud be pleased to invite us fr dinner tonight…

পিয়াল হেসে ফেলে বলল… if so…credit will go entirely to u Sir.
পরের দিনই রুপসা আবার ফোন করল দুপুরে…পরের শনিবার সকালের ফ্লাইটে আসছে…কোলকাতা পৌঁছে আগে ভবানীপুরের বাড়ীতে যাবে…অফিস থেকে বেরিয়ে অরিত্র যেন ওকে নিয়ে আসে। বাড়ী ফিরে যদি বলতে ভুলে যায় ভেবে ও তখন ই দিদানকে ফোন করে জানিয়ে দিল যে রুপসা আসছে। দেখতে দেখতে শনিবার এসে গেল, রুপসা কে নিয়ে ট্রেনে ফিরতে অসুবিধা হবে বলে ও আজ গাড়ী নিয়েই অফিস চলে এসেছে। একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল যাতে তাড়াতাড়ি ভবানীপুর থেকে বেরিয়ে পড়া যায়। ওখানে গিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি বেরোতে পারবে ভেবেছিল তা আর হল না, ছোটো জেঠিমা আর পুবালীদি একেবারে ছেঁকে ধরল ওকে। কেন ও আসে না…মাঝে মাঝে তো আসতে পারে…ওরা কি পর নাকি…এটা তো ওর নিজেরই বাড়ী…এখানে এসে না থাকুক…ঘুরে যেতে কি অসুবিধা। কিছুতেই না খাইয়ে ছাড়লো না…খেয়ে আরো কিছুক্ষন কাটিয়ে বেরোতে বেরোতে সাড়ে চারটে আর বাড়ী পৌঁছোতে প্রায় সাড়ে সাতটা বেজে গেল। মাঝে একবার দাদুকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে যে ওরা আসছে…না হলে চিন্তা করবে।

ভাইবোন এসে গেলে দিদান টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে বলল… রুপসা…আয়..আয়…কতদিন পরে এলি…মনে পড়ে না নাকি রে এই বুড়ো বুড়ী গুলোকে?

রুপসা দিদান কে জড়িয়ে ধরে বলল… আমার ঠিক মনে পড়ে…তোমার নাতি বরং ভুলে যায়…জিজ্ঞেস কর…একটা ফোন পর্যন্ত করে কিনা…ভাগ্যিস আমি সেদিন ফোন করলাম…না হলে তো এত বড় খবরটা জানতেই পারতাম না।

শুক্লাদি কাছেই দাঁড়িয়েছিল…মৌ শুক্লাদির পেছনে থেকে চোখ বড় বড় করে রুপসা কে দেখছিল। সারা মুখে বেশ একটা কৌতুহল…দিদিটা কেমন হবে কে জানে…যদিও শুনেছে দিদিটা খুব মিশুকে…

রুপসা ওকে দেখতে পেয়েই তাড়াতাড়ি করে গিয়ে… হাত ধরে বলল… এই…তুমি মৌ… তাই না… চলো…আমি নিজেই আলাপ করে নিচ্ছি… আমি কে জানো তো?

রুপসা যে এত তাড়াতাড়ি ওকে কাছে টেনে নেবে বুঝতে পারেনি… কয়েকদিন ধরে শুনছে একটা ভালো দিদি আসবে… কিন্তু এত ভালো বুঝতে পারেনি। ঘাড় নেড়ে জানালো…ও জানে।

দুটো অপরিচিত মেয়ে যে মন থেকে চাইলে কত তাড়াতাড়িকাছাকাছি চলে আসতে পারে তা বোধ হয় রুপসা আর মৌকে না দেখলে বোঝা যেত না। মৌ এর ঘরে বিছানায় বসে দুজনে আড্ডা দিচ্ছে…মনেই হচ্ছে না…ওদের একটু আগে দেখা হয়েছে… আর…ওদের একজন কথা বলতে পারে না। রুপসাই বেশি কথা বলছে…মৌ কখোনো হাসি মুখে…হাত বা মাথা নেড়ে ওর সাথে নীরবে কথা বলে যাচ্ছে।মাঝে একবার শুক্লাদি এসে ওদের কে কিছু স্ন্যকস আর কফি দিয়ে গিয়েছিল। অরিত্র ক্লাব থেকে ঘুরে এসে উপরে গিয়ে মৌ এর ঘরে উঁকি দিতেই রুপসা চেঁচিয়ে উঠল…এই দাদাভাই…ভেতরে আয় না…তুই কি রে…আমাদের কে ফেলে রেখে নিজে বেশ কেটে পড়লি।

আরে না…কেটে পড়িনি…পুজ়োর মিটিং ছিল…একবার মুখটা দেখিয়ে এলাম। তোরা তো শুনলাম…জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিস। তা…কি নিয়ে আড্ডা হচ্ছে শুনি।

রুপসা মুখটা একটু গম্ভীরকরে বলল…উঁ…হুঁ…তোকে বলা যাবে না…মেয়েদের গোপন আলোচনা ছেলেদের শুনতে নেই…জানিস না নাকি?

ঠিক আছে…আমি যাই…তোরা আড্ডা দে…

আরে বোস না…এমনি বললাম…আমাদের কি আবার গোপন কথা থাকতে পারে…তোকে নিয়েই কথা হচ্ছিল…

আমি আবার কি করলাম রে?

রুপসা চোখ ছোটো ছোটো করে বলল…ওঃ আমি আবার কি করলাম…এখন না হয় ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানিস না…ছোটো বেলায় কম দুষ্টু ছিলি নাকি…

মৌ অরিত্র আর রুপসার দিকে তাকাতে তাকাতে মুখ টিপে হাসছে দেখে অরিত্র বলল…একদম ওর কথায় বিস্বাস করবে না কিন্তু…সাঙ্ঘাতিক ফাজিল মেয়ে…

রুপসা ওর পিঠে একটা গাট্টা মেরে বলল…এই দাদাভাই…ভালো হবে না বলছি…আমি ফাজিল? আর তুই কি?

আমি আবার কি? আমি খুব ভালো…সবাই তো তাই বলে।

সে তো এখন বলে…তুই এত দুষ্টুমি করতিস যে দাদু তোকে দুষ্টূ বলে ডাকতো…ভুলে গেছিস নাকি?

ডাকতো কি রে…এখোনো মাঝে মাঝে ওই নামে ডাকে…
পরের দিন সকালে যথারীতি অরিত্র পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল, রুপসা ওর কাঁধে হাত রেখে আস্তে আস্তে করে ঝাঁকালে চোখ খুলে একবার তাকিয়ে আবার ঘুমোবার জন্য চোখ বুজে ফেললো…রুপসা ধপাস করে ওর পাশে বসে পড়ে বলল…এই দাদাভাই ওঠ না…

অরিত্র কোল বালিশ টাকে আরো ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে পাশ ফিরতে ফিরতে বলল…আর একটু ঘুমোতে দে না বাবা…তাড়াতাড়ি উঠে কি করবো…

রুপসা ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে দুষ্টুমি করে বলল…তোর জন্য কেউ একজন আসছে…তাই তাড়াতাড়ি উঠবি…আর…কোলবালিশটা কে এমন করে জড়াবার কি আছে…বাড়ীতে তো একজন আছেই জড়িয়ে ধরার জন্য…তার কাছে যেতে পারছিস না?

এই…রুপসা…ভালো হবে না বলছি…

ইস…ভালো হবে না বলছি…কি করবি রে তুই আমার… ব্যাটা বুদ্ধুরাম…কিচ্ছু বুঝিস না…

অরিত্র ঘুরে শুয়ে রুপসার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল…খুব প্রিয় কেউ একজন হাতে একটা ট্রে…তিনটে চায়েরকাপ তাতে…ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে…

রবিবারের বাজার টা সাধারনত অরিত্র ই করে, মোটামুটি সারা সপ্তাহে কি কি লাগতে পারে দেখে নিয়ে চলে আসে। বাজার থেকে ফিরে ক্লাবে গিয়ে একবার ঘুরে এলো…কালচারাল প্রোগ্রামের মিটিং ছিল…এবারে ওকে জয়েন্ট সেক্রেটারী করে দিয়েছে জোর করে…না গেলে খারাপ দেখাতো…ক্লাব থেকে ফিরে এলে দিদান বললো…রুপসা তোকে দুবার খুঁজে গেছে…। ঘরে ঢুকে দেখে দুজনে কালকের মতো গল্প করছে…রুপসা সরে গিয়ে ওকে বসতে বলে বলল…খুব মজা করছি রে দাদাভাই…আমি কিন্তু সব বলে দিয়েছি…বলেই মুখ টিপে হাসতে শুরু করল…

সব বলে দিয়েছিস মানে…বুঝলাম না…কি বলেছিস?

আরে সেই যে তোর আমাদের বাড়ী থেকে পালাতে গিয়ে বাগানে পা মুচকে সারা রাত বৃষ্টির মধ্যে পড়ে থেকে ধুম জ্বর এসে গিয়েছিল…

অরিত্র হেসে ফেলে বলল…ও আচ্ছা…কি জন্য পালাতে গিয়েছিলাম সেটাও বলেছিস নাকি?

বলবো না মানে…ওটাই তো আসল ব্যাপার…না বললে কি করে বুঝবে।

রুপসা…তুই না একটা যা তা…লজ্জা বলে কিছু নেই…ওটা আবার কেউ বলে নাকি।

রুপসা হেসে ফেলে বলল…দাদাভাই…মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানিস? তুই বোধ হয় ছেলেদের মতো দেখতে একটা মেয়ে… তোকে চুমু খেতে ইচ্ছে হয়েছিল…তাই খেয়েছিলাম…এতে আবার লজ্জার কি আছে? বয়স কম ছিল…

থাক তোকে আর পাকামো করতে হবে না…নিজের মাথা টা খারাপ আর এখন ওর মাথা টা খারাপ করছিস।

রুপসা মৌ এর দিকে তাকিয়ে বলল…জানো তো…দাদাভাই তার পর প্রায় এক বছর আমার সাথে কথা বলেনি…কত সাধ্য সাধনা করে যে বাবুর রাগ ভাঙ্গাতে হয়েছিল সে আমি জানি…

রবিবার দুপুরে এমনিতে খেতে কিছুটা দেরী হয়, আজ দিদান আর শুক্লাদি দুজনে মিলে রুপসা এসেছে বলে অনেক রকম রান্না করতে গিয়ে আরো একটু বেশী দেরী হয়ে গিয়েছিল। অরিত্র খাওয়ার পর কিছুক্ষন গড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়ল, সবাই বোধ হয় ঘুমোচ্ছে ভেবে ছাদে গিয়ে চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল…মাঝে মাঝে মনটা খুব অশান্ত হয়ে উঠছে…কি করবে কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না…কখন যে রুপসা এসেছে বুঝতে পারেনি। রুপসার ডাকে ফিরে তাকালো…কি রে দাদাভাই…কি ভাবছিস?

কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল…না…সেরকম কিছু না…এমনি ই ঘুম আসছিল না…

দাদাভাই তুই তো ভবানীপুরের বাড়ীতে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকতে পারিস…ছোড়দিরা খুব দুঃখ করছিল…

না রে…তুই যতটা সোজা ভাবছিস…তা নয়…উপরের ঘরটা তে গেলেই মনে হয় বাবা বসে আছে…বুকের ভেতর টা কেমন যেন গুমরে ওঠে…শুনেছি বাবা নাকি আমাকে খুব ভালোবাসতো…অফিস থেকে ফিরে আগে আমাকে কোলে নিয়ে আদর …তারপর…অন্য কাজ…গত বছর একদিন গিয়ে থাকার চেষ্টা করেছিলাম…সারারাত ঘুমোতে পারিনি…খালি মনে হচ্ছিল…মা বাবা…আমার দুদিকে বসে…বার বার বলছে…দুষ্টু…তোর দাদু দিদান খুব অসহায়…ওদের কে কোনো কষ্ট দিস না রে… তুই তো জানিস…রুপসা…দাদু, দিদান আর শুক্লাদির আমি ছাড়া আর কেউ নেই, তিনটে মানুষ আমার মুখ চেয়ে বেঁচে আছে…ওদের কষ্ট হবে ভেবে আমি কোথাও যেতে পারিনা…অফিস থেকে বার বার চাপ দিচ্ছে দু বছরের জন্য সিডনি যেতে…কোনো রকমে আটকে রেখেছি কিন্তু সামনের ডিসেম্বরে অন্তত দু মাসের জন্য যেতে হবেই। জানিনা কি হবে…দেখা যাক…যদি আটকাতে পারি…চাকরীটা ছেড়ে দেবো ভেবেছিলাম কিন্ত যেখানে জয়েন করবো সেখানেও তো একই রকম কিছু হতে পারে ভেবে আর এগোই নি… জানি না আমার জীবনে কেন এত সমস্যা…তোরা উপর থেকে হয়তো মনে করিস আমার মতো সুখী আর কেউ নেই…এত সম্পত্তি…দাদুর যা আছে আমি পাবো…ওদিকে ভবানীপুরে এত বড় বাড়ীর ভাগ…বম্বের মতো জায়গায় দু দুটো ফ্ল্যাট…ভালো চাকরী…কিন্তু মনের ভেতরে যে কি আছে আমিই জানি…ভীষন ভয় করতো…যার সাথে বিয়ে হবে সে দাদুদের কে মানিয়ে যদি না নিতে পারে…তার পর জীবনে এলো মৌ…যার দাদুদের কে মানিয়ে না নেবার কথা ভাবার কোনো প্রশ্ন উঠছে না কিন্তু…

রুপসা চুপ করে ওর কথা শুনছিল…থেমে যেতে দেখে ওর দিকে তাকালো…কিন্তু কি দাদাভাই…আমি যতদুর বুঝেছি…মৌ তোকে ভীষন ভাবে চায়…

জানি…

তাহলে? আটকাচ্ছে কোথায়?

ওর অতীত…আমরা তো কেউ জানিনা ও কে…

দাদাভাই…অতীত নিয়ে ভেবে কি লাভ আছে আমি জানি না…

জানি লাভ নেই…কিন্তু…এমনও তো হতে পারে ওর কেউ খুব কাছের আছে…কোনোদিন যদি ওর স্নৃতি ফিরে আসে আর ও তার কাছে ফিরে যেতে চায়…আমার কি উচিত হবে ওকে আটকানো…নাকি…আমি পারবো…

দাদাভাই…এখানে অনেক গুলো যদি আছে…এমন ও তো হতে পারে…তুই যা ভাবছিস … তা নয়… I feel…if you want to see the Light then you have to face the Dark….

অরিত্র কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর বলল…জানি…আমি কাউকে বোঝাতে পারবো না…
বিকালে রুপসা আর মৌকে নিয়ে ভবানীপুরের বাড়ীতে যেতে হবে, জেঠিমা আর পুবালীদি রুপসার কাছ থেকে মৌ এর ব্যাপারে শুনে ফোনেই খুব হইচই করে বলেছে একবার ওদের ওখানে নিয়ে যেতেই হবে। অরিত্র ওদের কে যে আগে জানায়নি তার জন্য দুজনেই খুব অভিমান করে বলেছে…তুই কি আমাদের পর ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিস না।পরে জানাবো ভেবেছিলাম…তারপর আর নানান ঝামেলায় জানানো হয়ে ওঠেনি বলে ওদের কে কোনোরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠান্ডা করেছে। দুটো নাগাদ বেরোতে হবে, না হলে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে বলে অরিত্র রুপসা কে তাড়া লাগালে কি হবে…সেই যে সাজতে বসেছে দুজনে…ওঠার নামই করে না। রুপসা মৌকে একটু একটু করে সাজিয়ে আরো অপরুপা করে তুলছিল…আই লাইনার টা খুব সাবধানে চোখের পাতায় বোলাতে বোলাতে ওর দিকে তাকিয়ে হাত যেন আটকে গেল…কি সুন্দর টানা টানা মায়াবী চোখ…দেখলেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে…

মৌ এর মুখটা দুহাতে আলতো করে ধরে বলল… এই…মৌ…

মৌ রুপসার দিকে তাকালো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে ওর চোখে চোখে রেখে ফিসফিস করে বলল……এই…তুমি আমার বৌদি হবে?

মৌ আস্তে আস্তে করে চোখ নামিয়ে নিল…একটু আগেই যে মুখে হাসি ছিল…এখন সেখানে যেন শ্রাবনের মেঘ…রুপসা বুঝতে পারছিল না ওর মনের ভাষা…যেটুকু বুঝেছে তাতে তো একবার ও মনে হয়নি যে ও দাদাভাই কে পছন্দ করে না…

এই আমার দিকে তাকাও…দাদাভাইকে কি তোমার ভালো লাগে না?

একবার চোখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে মুখ নাবিয়ে নিল…একটু একটু করে শ্রাবনের মেঘ সরে গিয়ে ওর মিষ্টি মুখে লাজুক হাসি ফিরে এসে বোঝালো…ভীষন ভালো লাগে…

তাহলে?

দু চোখের ভাষায় বোঝালো…শুধু কি আমার ভালো লাগলে হবে?

রুপসা একটু চুপ করে থেকে বলল…জানি…আমার দাদাভাই টা কি…বুক ফেটে গেলেও মুখ ফুটবে না…ওর কেন যে মনের ভেতরে এত কিন্তু বুঝি না। একটু থেমে মৌ এর কাঁধে হাত রেখে হাসি মুখে বলল…তুমি পারবে না আমার বুদ্ধু দাদাভাই টাকে দিয়ে বলাতে যে ও তোমাকে চায়?
জেঠিমা আর পুবালী খুব খুশী ওদেরকে পেয়ে। সবাই মিলে গল্প করতে করতে জেঠুও অফিস থেকে ফিরে এলো। কোনো রকমে জেঠিমা আর পুবালীদিকে বোঝাতে পারলেও জেঠুকে বোঝানো খুব মুশকিল হয়ে গেল, সেই এক প্রশ্ন…অরিত্র কেন এই বাড়ীতে আসে না। খুব দুঃখ করে বললো…আমি জানি তোর কষ্টটা কোথায়…কিন্তু একটা কথা তুই বুঝতে চাস না…তোর ও যেমন মা বাবা কে হারানোর দুঃখ আছে, আমারও কি কম কষ্ট হয় নিজের ছোটো ভাইকে আর বৌমাকে হারিয়ে। তাছাড়া…তুই একবার ভাব…আমাদের তিন ভাই এর ছেলে মেয়েদের ভেতরে তুই এক মাত্র ছেলে…একটা মেয়ের তো বিয়ে হয়ে গেছে …পুবালীরও বিয়ের চেষ্টা চলছে…আর বাকি থাকলো রুপসা…ওরা সবাই চলে গেলে আমরা কাকে নিয়ে থাকবো বলতো?…জানি তুই ছাড়া তোর দাদু দিদানের আর কেউ নেই…তবুও আমাদেরও তো তোর উপরে একটা অধিকার আছে…

অরিত্র কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল…জানি…তোমাদের জন্যও আমার কিছু কর্তব্য আছে… আর জানি বলেই মাঝে মাঝে নিজের উপরে একটা ধিক্কার আসে…সব দিক বজায় রাখতে পারিনা…আমি বোধ হয় একটা অপদার্থ…কি করবো বুঝতে পারি না…

ওদের কথার মাঝে জেঠিমা চলেএল…দুজনেরই মুখ থমথমে দেখে বলল…তুমি কি বলোতো…ছেলেটা এতদিন পর এলো…আর তুমি ওকে নিয়ে পড়ে গেলে…ওর দিকটাও একবার ভেবে দেখো…এইটুকু বয়সে ওকে যা দায়িত্ব নিতে হয়…কটা ছেলে নেয় বলোতো…

জেঠু কিছু বলতে যাচ্ছিল দেখে জেঠিমা থামিয়ে দিয়ে বললো…আরে বাবা…এত চিন্তা করার কিছু নেই… আমাদের ছেলেটাকে আর একটু বড় হতে দাও…বিয়ে হোক…আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে…

হলেই ভালো…

আচ্ছা শোনো…তোমার সাথে একটা কথা আছে…দুষ্টু আছে…ওর সামনেই সেরে নেওয়া ভালো…

জেঠু হেসে ফেলে বলল…তুমি এখোনো ওকে দুষ্টু বলা ছাড়লে না…

জেঠিমা অরিত্রর পাশে বসে বলল…ও আমার কাছে চিরকাল দুষ্টুই থাকবে…কি রে…তুই আবার দুষ্টু বললে রাগ করিস না তো?

ঘরের একটু আগের গুমোট হাওয়াটা কেটে যাওয়াতে সবারই ভালো লাগছিল। অরিত্র হেসে বলল…রাগ করবো কেন…ছোটো বেলায় তো কম জ্বালাইনি তোমাদেরকে।

জেঠু হো হো করে হেসে ফেলে বলল…তোর দুষ্টুমি চলে গেলেও নামটা থেকেই গেল…কি বল। তারপর জেঠিমার দিকে তাকিয়ে বলল…বলো…কি বলবে বলছিলে…

বড়দি পুবালীর জন্য একটা ভালো ছেলের কথা বললো আজ…নিজে খুব একটা বিশেষ কিছু জানে না… ভালো ছেলে শুনে তাড়াতাড়ি করে খবরটা দিয়ে বলেছে সব কিছু দেখে নিতে…টিসিএস এ কাজ করে…দুষ্টু…তুই যদি একটু খোঁজ খবর নিয়ে বলতে পারিস…বুঝতেই পারছিস…একটা মাত্র মেয়ে…আজকাল যা হচ্ছে…খুব চিন্তা হয়…তোর জেঠুরতো অফিস ছাড়া আর কিছু জানা নেই…খোঁজ নিতে বললে কবে বাবুর সময় হবে তার ঠিক নেই…

জেঠিমা তুমি চিন্তা কোরোনা…তুমি ডিটেলস টা দিয়ে দাও…আমি সামনের সপ্তাহের ভেতরে খোঁজ নিয়ে নিচ্ছি…ছোড়দি জানেতো? না হলে আবার সেই আগের বারের মতো কান্নাকাটি জুড়ে দেবে।

না… না…অনেক বোঝানোর পর রাজী হয়েছে…এখন আর কোনো সমস্যা নেই…ওর একটাই শর্ত… বিয়ের পরেও চাকরী করতে দিতে হবে…না হলে এত পড়াশোনা করে কি লাভ।

ঠিকই তো বলেছে…

জ্জেঠু জেঠিমার সাথে কথা বলতে বলতে পুবালী এসে অরিত্রর হাত ধরে টেনে বলল…এই ভাই…চল…আমাদের সাথে গল্প করবি…কি খালি…বড়দের সাথে মুখ গোমড়া করে বসে আছিস।

অরিত্র পড়ে যেতে যেতে সামলে নিয়ে বলল…আচ্ছা বাবা…চল…যাচ্ছি…কোন দিকে যাই বলতো…তোর সাথে গল্প না করলে অভিমান করে বসে থাকবি…জেঠু জেঠিমাকে একটু সময় না দিলে তাদেরও খারাপ লাগবে।

পুবালী হাসতে হাসতে বলল…এক কাজ কর না…আজকাল কি সব গাড়ী বেরিয়েছে না…সব জায়গায় চলে…ওই একটা কিনে ফেল…তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না, অফিস ফেরত হুস করে চলে আসবি।
জেঠু হাসতে হাসতে বলল…হ্যাঁ…আসার সময় তোকেও তুলে নিয়ে এলে আরো ভালো হয়…
অরিত্র সামনের সপ্তাহের জন্য অপেক্ষা না করে পরের দিনই ওদের অফিসের এইচআর এর অনিন্দ সেন কে ফোন করে পুবালীর জন্য যে ছেলেটির খোঁজ এসেছে তার ব্যাপারে কথা বলে নিল…সেন দা নিজের প্রফেশানের সুবাদে অনেকের সাথে পরিচয় আছে যারা বিভিন্ন কোম্পানীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে…এছাড়া ও নিজে এর আগে অনেক কোম্পানী ঘুরে আসায় পরিচিতি বেড়েছে…ওনার পক্ষে খোঁজ নেওয়াটা খুব একটা বড় কিছু নাও হতে পারে। সেন দা মাত্র দিন তিনেকের মধ্যে ছেলেটির হাঁড়ির খবর অব্দি জোগাড় করে অরিত্রকে ফোনে সব জানিয়ে দিল। সব দিক থেকে মোটামুটি ভালোই…এগোনো যেতে পারে বলে মনে হতে অরিত্র জেঠিমাকে ফোনে সব জানিয়ে দেবার পর আলাদা করে ছোড়দি কে ও জানাতে হল, পুবালী বার বার করে বলে দিয়েছিল…ওকেও জানাতে। পুবালীর সাথে কথা বলার সময় রুপসা পাশে ছিল, অরিত্রর কথা বলা হয়ে গেলে রুপসা ফোনটা প্রায় কেড়ে নিয়ে…প্রথমেই ওর স্বভাব মতো এক নাগাড়ে কিছুক্ষন বকে গেল…দিদিভাই…এ তো সোনার টুকরো ছেলে মনে হচ্ছে রে…তাই বলে আবার কিছু না দেখে রাজী হবি না কিন্তু…জেঠিমারা যা করবে করুক…তুই কিন্তু মাঝে মাঝে দেখা করবি…না হলে বুঝতে পারবি না…ভেতরে ভেতরে কিছু গন্ডগোল আছে কিনা…সব যদি দেখিস ঠিক আছে তবেই রাজী হবি।ওদিক থেকে পুবালী কিছু একটা বললে…রুপসা হেসে ফেলে বলল…ঠিক আছে রে দিদিভাই…রাখি এখন…জানাস কিন্তু।

অরিত্র ওর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে হেসে ফেলে বলল…এই রুপসা…তুই কি ছোড়দির ঠাকুমা নাকি রে…এমন ভাব করছিস যেন…সব কিছু জেনে বুঝে গেছিস।
এই দাদাভাই…ভালো হবে না কিন্তু…তুই কিছু বুঝিস না বলে কি আমি কিছু বুঝবো না নাকি।
আমি আবার কি বুঝি না রে?
তুই কিচ্ছু বুঝিস না…হাঁদারাম কোথাকার…আমি যদি তুই হতাম…কবেই I Love You বলে দিতাম…
খুব সোজা না? নিজে তো আজ অব্দি একটা জোটাতেও পারলি না।
রুপসা চোখ ছোটো ছোটো করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল…এই দাদাভাই…বাজে বকবি না…অনেক আগেই আমি জোগাড় করে ফেলেছিলাম…রাজী না হলে কি করবো?
আমি বাজে বকছি নাকি তুই বাজে বকছিস রে? তুই কাউকে জোগাড় করলে আমাকে না বলে থাকতে থাকলি কি করে?
রুপসা ফিক করে হেসে ফেলে বলল…তোকে আবার আলাদা করে কি জানাবো? এই জন্যই তো তোকে হাঁদারাম বলি…
মানে?
মানে আবার কি…ওটা তো তো তুই ছিলি রে…বুঝলিই না আমার ভালোবাসা কতটা খাঁটি ছিল…প্রথম প্রেম…কি রোমান্টিক হয়…
দাঁড়া তোর রোমান্টিক হওয়া আমি দেখাচ্ছি…অসভ্য…ফাজিল মেয়ে কোথাকার…
এই দাদাভাই…চুলে হাত দিবি না কিন্তু…খুব খারাপ হয়ে যাবে…
ওদের ভাই বোনের খুনসুটির মাঝে মৌ ঘরে ঢুকলো একটা প্লেটে কিছু স্ন্যাক্স আর কফি নিয়ে, এতক্ষন দিদানের সাথে কিচেনে ছিল, গালের এক দিকে বোধ হয় হলুদের দাগ, নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। একেবারে শেষের দিকে আসায় বুঝতে পারছিল না ব্যাপারটা কি…দু হাতে খাবারের ট্রে টা ধরে দাঁড়িয়ে থেকেএকবার অরিত্রর দিকে আর একবার রুপসার দিকে তাকাতে তাকাতে বোঝার চেষ্টা করছিল কি ব্যাপার।

অরিত্র ওর অবস্থা দেখে বলল…আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই…আমি বলতে পারবো না…ওই ফাজিল মেয়েটাকে জিজ্ঞেস কর…যত বড় হচ্ছে তত ফাজলামো বাড়ছে…

রুপসা মৌ এর হাত থেকে ট্রেটা নিয়ে বিছানায় রেখে দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলল…দাদাভাই আমার প্রথম প্রেম বলে পেছনে লাগছিলাম…জানো তো কি রেগে গিয়েছিল…

মৌ মুখ টিপে হাসতে হাসতে অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করল…তুমি সত্যি ই বুদ্ধুরাম…কিচ্ছু বোঝো না…
দেখতে দেখতে রুপসার ফেরার দিন চলে এলো। আজ বিকেলের ফ্লাইটে ফিরে যাবে। সকাল থেকেই মৌ ওকে কাছ ছাড়া করতে চাইছিল না, মুখে একটুও হাসি নেই।দু চোখে ভীষন কষ্ট পাওয়ার আভাস। রুপসা ওকে বার বার বোঝানোর চেষ্টা করছে…আবার আসবে বলে…কিন্তু কিছুতেই ওর মুখে হাসি ফেরাতে পারছে না।মাঝে দুবার রুপসাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটিও করেছে।বেরোবার কিছুক্ষন আগে চোখে মুখে জল দিয়ে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে কিন্তু তাতে ওর বিষন্নতা বিন্দুমাত্র কমেনি। দিদান ওর অবস্থা দেখে অরিত্রকে বলল…তুই বরং ওকে সাথে নিয়ে যা…না হলে তোরা বেরিয়ে যাবার পর আরো কান্নাকাটি করবে।
এয়ারপোর্ট যাবার সময় সারাক্ষন ও রুপসা কে জড়িয়ে ধরে বসেছিল…রুপসা ওর সাথে গল্প করে যেতে যেতে এখন অনেক টা স্বাভাবিকহয়ে এসেছে। রুপসা বোর্ডিং পাস নিয়ে সিকিউরিটি চেকের আগে ফিরে এসে শেষবারের জন্য দেখা করে চলে গেল। শেষ বারে আর না কেঁদে হাসি মুখে রুপসা কে বিদায় জানিয়ে কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর অরিত্রর দিকে তাকা্লো…যেন বলতে চাইছে…চলো…এবার ফিরে যাই।
রুপসা ফিরে যাবার পর আবার আগের মতো একটা একটা করে দিন গুলো কেটে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে পূজো এগিয়ে আসছিল, অরিত্রর ব্যাস্ততা আগের থেকে কিছুটা বেড়েছে, অফিসের কাজের মাঝে মাঝে পূজোর ব্যাপারেও সবার সাথে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছিল। এর মাঝে জেঠিমা একদিন ফোন করে বলল…সামনের রবিবার বিকেলে ছেলের বাড়ী থেকে দেখতে আসবে, অরিত্র এলে খুব ভালো হয়। সেই মতো রবিবার সকালে বাজার থেকে ঘুরেএসে ভবানীপুরের বাড়ীতে আসতে হয়েছে। জেঠু জেঠিমা সবকিছু হয়তো সামলাতে পারবে না ভেবে আগের দিনই বলে দিয়েছিল ও দুপুরের মধ্যে এসে যাবে। দুপুরে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে পুবালী কে নিয়ে বেরোতে হল বিউটি পার্লারে যাবার জন্য, পুবালীকে বেশ চুপচাপ দেখে জিজ্ঞেস করল…কি রে ছোড়দি…এত চুপচাপ কেন…টেনশান হচ্ছে?
টেনশান তো একটু হবেই…কেমন হবে কে জানে।
তা ঠিক।
রুপসা আজ সকালে ফোন করেছিল…ওর সেই এক কথা…কিছুদিন মেলামেশা করে দেখতে বলছে।
ঠিকই তো বলছে…আজকাল সবাই তাই করে।
ধুস…আমার কেমন যেন লাগছে…কি করে বলবো বুঝতে পারছি না।
অরিত্রর হেসে ফেলে বলল…ছোড়দি…তুই সেই একই রকম থেকে গেলি…এতে আবার লজ্জা পাওয়ার কি আছে। ঠিক আছে…চল…আমিই বলে দেবো।

না রে ভাই…ওর বাড়ীর লোকজন যদি আবার খারাপ কিছু ভেবে বসে।

কিচ্ছু খারাপ ভাববে না…আর ভাবলেই বা কি…সারা জীবনের ব্যাপার…কিছুটা তো দেখে শুনে নেওয়া দরকার…তুই এত চিন্তা করিসনা তো…আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেবো।

ওর কথা শুনে পুবালী কিছুটা স্বস্তির নিস্বাস ফেলে বলল…দেখ…কি করতে পারিস…প্রথম দু এক দিন কিন্তু তুই সাথে থাকবি…আমি একা একা দেখা করতে পারবো না।

তুই কি রে ছোড়দি…আমাকে আবার থাকতে হবে কেন?

আমার ইচ্ছে…তাই থাকবি। তুইতো জানিস…আমি রুপসার মতো এতো স্মার্ট নই।

মোটামুটি ভালোয় ভালোয় মেয়ে দেখার ব্যাপার টা মিটে গেছে। দু তরফেরই অন্যদেরকে প্রাথমিক ভাবে পছন্দহয়েছে। কিছুদিন ওরা দেখা সাক্ষাত করার পর সব কিছু ঠিক থাকলে বাকি ব্যাপার গুলো নিয়ে এগোতে কারুরই আপত্তি হয়নি। সেই মতো পরের সপ্তাহে অরিত্র অফিস থেকে বিকেলে বেরিয়ে পুবালীকে নিয়ে মনি স্কয়ারে এসেছিল। ওখানে শুভ্রদীপ মানে যার সাথে বিয়ের কথা চলছে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারপরে আরো একদিন পুবালীর সাথে যেতে হয়েছিল, তারপর থেকে ওরা নিজেরাই নিজেদের মতো দেখা করে নিত। এর মাঝে একদিন বড় জেঠু আর জেঠিমা বম্বে থেকে এসেছে, রুপসাও সাথে ছিল। উদ্দেশ্য সবাই মিলে শুভ্রদীপের বাড়ী ঘুরে আসা। অরিত্রকে ও যেতে হয়েছিল ওদের সাথে। রুপসা এর আগে শুভ্রদীপের ফোটো দেখেছিল, এই প্রথম মুখোমুখি দেখা। বাড়ী ফেরার পর পুবালী কে জড়িয়ে ধরে ওর খুশীর যেন অন্ত নেই, বিয়েটা যেন পুবালীর সাথে নয়, ওর সাথে হবে। ছোড়দি…দারুন হবে রে…কি হ্যান্ডসাম…আগে বলিসনি তো…কি মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে…মাসীমা মেশোমশায় ও কি ভালো… ছোড়দি…তুই হ্যাঁ বলে দে…বলে পুবালীর মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল।

পরের দিন রুপসা একাই চলে এসেছিল অরিত্র দের বাড়ী,জেঠিমার ও আসার ইচ্ছে ছিল কিন্তু পুবালীর বিয়ের ব্যাপারে এখন আর কোনো বাধা না থাকায় ওরা থাকতে থাকতেই বাকি ব্যাপার গুলো সেরে ফেলতে হবে বলে আসতে পারেনি। রুপসার কোলকাতা এলে নিজের বাড়ীতে থাকার চেয়ে অনেক বেশী ভালো লাগে দাদাভাইদের ওখানে, কি সুন্দর খোলামেলা গাছ গাছালী তে ভরা নির্জন জায়গা, তার সাথে পাশেই নদী…বিকেলে ছাদে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে কি করে সময় কেটে যায় বোঝাই যায় না। এখন আবার মৌ এর সাথে এত নিবিড় একটা মিষ্টি সম্পর্ক হয়ে গেছে যে ওকে কাছে না পেলে যেন ভালো লাগে না। ওদিকে বিয়ের দিন ঠিক করতে গিয়ে একটু আটকে গেল, ডিসেম্বর মাসে অরিত্র থাকছে না…ওর ফিরতে ফিরতে জানুয়ারীর শেষ হয়ে যাবে আর ওর যাবার আগেও সম্ভব নয়, তাই একটু ঠান্ডা থাকতে থাকতে ফেব্রুয়ারীতেই একটা দিন ঠিক করা হয়েছে ছেলের বাড়ীর সাথে কথা বলে। প্রথমে শুভ্রদীপের বাবা একটু গররাজী ছিলেন কিন্ত অরিত্র বাড়ীর এক মাত্র ছেলে আর ও না থাকলে খুব খারাপ দেখাবে বলে রাজী হয়ে গেছেন। রুপসা দিন তিনেক থেকে মৌকে সাথে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল পুবালীকে কিছুটা সময় দেবার জন্য। পুবালীও চাইছিল রুপসা থাকতে থাকতে কিছু কেনা কাটা সেরে ফেলতে। অফিস, পাড়ার পূজো আর তার সাথে পুবালীর বিয়ে, সব কিছু সামলাতে গিয়ে অরিত্র বেশ চাপের মধ্যে, তার উপরেআবার এখোনো পূজোর কেনাকাটা কিছু করে উঠতে পারেনি। এক জায়গায় গেলে যে সব কিছু কেনা যাবে সেটা ও সম্ভব নয়, দাদু, দিদান আর শুক্লাদির জন্য এক রকম, জেঠু জ়েঠিমাদের জন্য আর একরকম…বড়দি, জামাইবাবু, বড়দির ছেলে পাপাই, ছোড়দি, রুপসা, সাথে মৌ…তাদের জন্য আবার যার যেটা লাগবে কিনতে হবে, ভেবে ঠিক করতে পারছিল না কবে কি করে উঠতে পারবে। বাধ্য হয়ে আবার দিন তিনেকের ছুটি নিয়ে এক এক করে সব কেনাকাটা করে ফেলল দুই বোন আর মৌকে সাথে নিয়ে। মৌ কিছু নিতে চাইছিল না…এই তো সেদিন এত কিছু কেনা হয়েছে বলে। রুপসা আর পুবালী দুজনে মিলে ওকে বুঝিয়ে রাজী করাতে তবে কিনতে দিয়েছে। এবারে আর নারায়ন দা আর ওর বাড়ীর বাকিদের জন্য নিজে কিছু কিনে উঠতে পারেনি বলে একদিন রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে নারায়ন দার হাতেকিছু টাকা জোর করে দিয়ে এসেছে।

জেঠুরা বম্বে ফিরে যাবার পরে আরো দিন সাতেক পরে রুপসা ফিরে গেছে, তার আগে ওরা দুই বোন মৌকে নিয়ে এসে একদিন থেকে ফিরে গিয়েছিল, শুধু মৌকে দিতে আসা নয় সাথে সবার জন্য পূজোর জামাকাপড় দেওয়ার ব্যাপারটাও ছিল। পুজোর আর মাত্র দিন দশেক বাকি আছে, এখন আর সেই চাপ নেই…মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে দেখেঅরিত্র পাড়ার পূজোর দিকে একটু বেশি নজর দিতে পারছে। বিশেষ করে সপ্তমীর সন্ধেবেলা বাচ্চাদের যে নাটক টা হওয়ার কথা আছে সেটা ওরই মাথার থেকে বের করা, এতদিন নিজে বেশী সময় দিতে পারছিল না বলে ওর এক বন্ধু, শুভ ওর হয়ে রিহার্সালের দেখভাল করছিল। শনিবার তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে শেষ রিহার্সাল হয়ে যাবার পর মোটামুটি নিশ্চিন্ত বাচ্চাগুলো ডোবাবে না। খুশী হয়ে সবাইকে একটা করে ক্যাডবেরী দিয়ে বাড়ী পাঠিয়ে দিয়ে আরো কিছুক্ষন ক্লাবে আড্ডা দিয়ে বাড়ী ফিরছিল, ফোনটা বেজ়ে উঠল… রিং টোন টা … তু কাঁহা…এ বাতা… ওর বস ত্রিদিব বাসুর ফোন… ইচ্ছে করেই এই রিং টোন টা সেট করে রেখেছিল যাতে সবার থেকে আলাদা করা যায়। কিছু নিশ্চয় সমস্যা হয়েছে না হলে শনিবার এই সময়ে ফোন করার কথা নয় ভেবে ফোন টা রিসিভ করল…আজকে রাতের মধ্যে একটা প্রেজেন্টেশান তৈরী করে দিতেই হবে, সোমবার ফরেন কাস্টমার মিট আছে। এটা তো নেহার করার কথা বলাতে বলল… নেহা আজ হাসব্যান্ডের সাথে ঝামেলা করে দিল্লী চলে গেছে মায়ের কাছে, অরিত্র না করে দিলেই নয়। সেই মতো খেয়ে উঠে এগারোটা নাগাদ বসল কাজটা করতে, সেন্ট্রাল সার্ভার থেকে কিছু ডেটা নিয়ে প্রোজেক্টটা বানাতে হবে কিন্তু ব্রডব্যান্ড ভীষন স্লো চলছে। কিছু করার নেই… আস্তে আস্তে কাজ এগোচ্ছে। রাত প্রায় দুটো বাজে, মাঝে একবার নিচে গিয়ে কফি বানিয়ে নিয়ে এসে এক মনে কাজ করছিল… কাজটা মোটামুটি অনেকটাই হয়ে এসেছে, আরো ঘন্টা খানেক হয়তো লাগতে পারে। কাঁধে কারুর হাতের ছোঁয়া…মুখ তুলে তাকালো…মৌ ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দু চোখে বকুনি দেবার ইচ্ছে… রাত জেগে এত কাজ করারকি দরকার… যাও…ঘুমোও।

এই আর একটু বাকি আছে… বলাতে খালি কফির কাপটা তুলে নিয়ে ফিরে গেল। একটু পরেই আবার ফিরে এলো… এক কাপ কফি নিয়ে। কি করে বুঝলো যে আমার আর একবার পেলে ভালো হত ভাবতে ভাবতে হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল… কি করে বুঝলে?

ওর মুখের মিষ্টি হাসি হয়তো বোঝালো… তুমি কি চাও যদি না বুঝতে পারি তাহলে তোমাকে নিজের করে নেবো কি করে।

কফির কাপটা টেবিলে রেখে ওর পাশেই দাঁড়িয়ে দেখছিল ও কি করছে। অরিত্র ওর দিকে তাকিয়ে বলল… শুতে যাবে না?

মাথা নেড়ে জানালো…না।

আমার তো আরো একটু সময় লাগবে…তুমি জেগে থাকবে আমার জন্য?

হাসি মুখে ঘাড় কাত করে বোঝালো…কোনো অসুবিধা নেই… তোমার জন্য আমি সব করতে পারি।

এক নাগাড়ে কাজ করতে করতে কিছুটা হলেও একঘেয়েমি এসে গিয়েছিল… ভীষন ভালো লাগছিল ওকে কাছে পেয়ে…মন চাইছে ও পাশে থাকুক… কিন্তু ও এত কাছে থাকলে কাজে মন দিতে পারবে না তাছাড়া শুক্লাদি ঘুম ভেঙ্গে গেলে ওকে দেখতে না পেয়ে যদি এখানে চলে আসে… যদি কিছু ভাবে…যদিও ওরা এমন কিছু করেনি যেটা চোখে লাগার মতো… চিন্তা করে হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে বলল… তুমি এত কাছে থাকলে যে আমি কাজ করতে পারবো না।

মুখটা একটু গোমড়া করে সোফার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বোঝালো… ও ওখানে বসতে চায়।

আচ্ছা…বোসো… বলাতে… খুশী হয়ে সোফাতে গিয়ে বসল।

অরিত্র কাজ করতে করতে একবার পেছন ফিরে ওর দিকে তাকালো… মৌ চুপচাপ বসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে… ওকে তাকাতে দেখে… মাথা নেড়ে বোঝালো…আমার দিকে তাকাতে হবে না…তুমি তোমার কাজ কর।

আরো কিছুক্ষন কেটে গেছে,তিনটে বেজে দশ। কাজটা শেষ, অনেক বড় হয়ে গেছে প্রেজেন্টেশানটা… মেলে পাঠানো যাবে না দেখে সার্ভারে আপলোড করতে দিয়ে চেয়ার টা ঘুরিয়ে ওর দিকে মুখ করে বসে দেখছিল মৌ কি করছে।অরিত্র যে ওর দিকে তাকিয়ে আছে খেয়াল করে নি… এক মনে এক বার অরিত্র কি করছে আর তার পরেই ও অরিত্র কে কি বলছে… অভিনয় করে যাচ্ছে। দেখে যা বোঝা গেল… অরিত্র দুহাতে ল্যাপটপের কি বোর্ডে টাইপ করছে… তার পরেই মৌ অরিত্রকে বকুনি দিয়ে বলছে…যাও…আর কাজ করতে হবে না…অরিত্র মৌ কে বলছে…আর একটু…মৌ মাথা নেড়ে বলছে… না…আর নয়…অনেক রাত হয়েছে…শুতে যাও। মৌ শুতে যেতে বলাতে অরিত্র কিছু বলতে যাচ্ছিল… মুখ তুলে তাকিয়ে অরিত্র ওকে দেখছে বুঝতে পেরে লজ্জা পেয়ে গিয়ে মুখ নামিয়ে নিয়ে বসে থাকলো… ভাবছিল হয়তো… ইস…কতক্ষন ধরে দেখছে কে জানে। অরিত্র পেছন ঘুরে আপলোড হয়ে গেছে দেখে, ল্যাপটপ শাট ডাউন করতে দিয়ে উঠে গেল ওর সামনে…তখোনো মুখ নিচু করে বসে আছে…সারা মুখে লাজুক হাসি।

ভীষন ভালো লাগছিল দেখতে ওর ওই লজ্জা পাওয়া… ওর কাঁধে হাত রেখে আস্তে করে ডাকলো… এই…

আস্তে আস্তে মুখ তুলে তাকালো…মুখে এখোনো সেই লাজুক হাসি…দু চোখে জিজ্ঞাসা… বলো…কি বলবে।

ঘুম পাচ্ছে না?

উঁহু…

হুম…তাহলে আমি বসি এখানে?

না…

বারে…তুমি এখানে থাকলে আমি কি করে শুতে যাই?

আর কোনো কিছু বোঝাবার চেষ্টা না করে চুপ করে কিছুক্ষন একভাবে তাকিয়ে থাকলো চোখে চোখ রেখে… কিছু হয়তো বোঝাতে চাইলো…কিন্তু বোঝা গেল না… আলতো ভাবে একবার ওর হাত টা ধরে উঠে দাঁড়ালো… চোখের ভাষায় বোঝাতে চাইলো… আমি এবারে আসি?

ওর নীরব প্রশ্নের উত্তরটা নীরবেই দিলে একটু জোরে হাতে চাপ দিয়ে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চাইলে… একবার মনে হল… ওকে আটকায়…নাঃ থাক… অনেক রাত হয়েছে… আর…ওকে কেনই বা আটকাবো… আমি কি পারছি…ও যা চায় তা দিতে।ইচ্ছে টা মনের ভেতরেই রেখে দিয়ে হাসি মুখে বলল… কাল সকালে কিন্তু এক সাথে চা খাবো…
দেখতে দেখতে পূজো শুরু হয়ে গেল, সপ্তমী থেকে ছুটি শুরু…চারটে দিন পাড়ার পুজো, কালচারাল প্রোগ্রাম আর একদিন রাতে কোলকাতায় গিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সাথে সারা রাত প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো আর একদিন দাদু দিদান দের নিয়ে বেরোনো ছিল গত দু তিন বছরের ছক কিন্তু এবারে হয়তো কিছুটা অন্য রকম কিছু ভাবতে হবে। মৌকে নিয়ে বন্ধুদের সাথে বেরোনো যাবে না আবার বন্ধুদের সাথে না বেরোলে ওরা আবার পেছনে লাগবে। একবার ভাবলো দাদুদের কে নিয়ে যেদিন বেরোবে সেদিন তো মৌ এর ও ঘোরা হয়ে যাবে তাহলে আর আলাদা করে বেরোনোর দরকার থাকবে না কিন্তু তার পরেই মনে হল একবার ওর সাথে কথা বলে নেবার দরকার আছে না হলে মন খারাপ করতে পারে। দিদান হয়তো বুঝতে পেরেছিল ওর সমস্যাটা তাই নিজের থেকেই সপ্তমীর দিন দুপুরে খেতে বসে কথাটা তুললো…

আমরা আর এ বছর বাইরে কোথাও যাবো না ভাবছি…বাড়ীর সামনেই তো পূজো হচ্ছে…এখানেই কাটিয়ে দেবো।

অরিত্র খাওয়া থামিয়ে দিদানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল…প্রতি বছরই তো এখানে পূজো হয় আর আমরা বেরোই…এবারে আবার আলাদা কিছু আছে নাকি?

দিদান হেসে বলল…মৌকে নিয়ে বেরোতে হবে তো… নাকি…মেয়েটা পূজোর সময়েও বাড়ীতে বসে কাটাবে।আমাদের না হয় বয়স হচ্ছে…ওর তো বাইরে বেরোতে ইচ্ছে হয়।

দাদু আর শুক্লাদিও দেখা গেল দিদানের সাথে একমত…মনে হয় ওরা আগেই নিজেদের ভেতরে আলোচনা করে রেখেছিল। মৌ মাথা নেড়ে বোঝালো ও রাজী নয়। অরিত্র কিছুক্ষন ভেবে বলল…একদিন তো আমি একাই বেরোই…সেদিন ওকে নিয়ে বেরোনো যাবে।

দিদান শুনে বলল…একটা দিনই তো বন্ধুদের সাথে বেরোস…ওদের সাথে না বেরোলে আবার খারাপ ভাববে না তো?

দেখি কি করা যায়…

অরিত্র খাওয়ার পর একটু গড়িয়ে নিয়ে মৌ এর সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখলো ও ঘরে নেই…হয়তো ছাদে গেছে…ফিরে আসবে ভেবে অপেক্ষা করছিল…ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে…দেখলেও ভালো লাগে। কিছুক্ষন পর কি মনে করে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো মৌ দুহাতে কিছু শুকনো জামাকাপড় বুকে চেপে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু চোখে জিজ্ঞাসা…কিছু বলবে?

অরিত্র ওর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল…কি হল…বসতে বলবে না নাকি?

দুষ্টুমি ভরা হাসি মুখে নিয়ে মাথা নেড়ে উত্তর দিল…নাঃ…

হুম…তাহলে যাই…ভেবেছিলাম তোমার সাথে গল্প করবো।

একটু অবাক হবার ভান করে যেন জিজ্ঞেস করল…তাই?

হুম…তাই…

সারা মুখে মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে এসে বিছানার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বোঝালো…বোসো।

অরিত্র ওর বিছানায় বসে ওকেও ইশারা করে বসতে বললে জামাকাপড় গুলো রেখে উল্টোদিকে বসে ওর দিকে তাকালো…যেন বলতে চাইছে…বলো…কি বলবে।

ভাবছি…এবারে আর বন্ধুদের সাথে বেরোবো না।তোমাকে নিয়ে একদিন বেরোবো।

মাথা নেড়ে জানালো…সেটা ঠিক হবে না।

কেন…তুমি যাবে না ঠাকুর দেখতে?

হ্যাঁ।

কি করে হবে…একদিন দাদুদেরকে নিয়ে বেরোবো…একদিন বন্ধুদের সাথে বেরোবো…তোমাকে নিয়ে তাহলে আলাদা করে কি করে বেরোবো?

ঠোঁট উল্টে বোঝালো…সে আমি কি জানি…তুমি ভাবো কি করবে।

ওর দুষ্টূমি ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে অরিত্র ভাবছিল…কি করা যায়…ওকে নিয়ে কাছাকাছি ঘুরে এসে তারপর একটু দেরীতে বন্ধুদের সাথে বেরোনো ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই বলাতে মাথা নেড়ে জানালো…চলবে।

বিকেল থেকে অরিত্রর টেনশান শুরু হয়ে গেল…বাচ্চাগুলো কি করবে কে জানে…যদিও শেষ দিনের রির্হাশাল দেখে তো মনে হয়েছিল ভালোই করবে…তবুও…বড়রা হলে না হয় হোতো…বাচ্চাদের নিয়ে কিছু করা সত্যিই টেনশানের। সাড়ে ছটায় নাটক শুরু হওয়ার কথা… চারটের মধ্যে সবাইকে আসতে বলা ছিল… বিকেলের চা খেয়েই দৌড়ল ক্লাবের দিকে। নাঃ…ঠিকই আছে…বাচ্চারা সবাই এসে গেছে…মেকআপ চলছে… এক এক করে সবার পিঠ চাপড়ে উতসাহ দিয়ে স্টেজের অবস্থা কি দেখতে গেল। যদিও চিন্তা করার কোনো কারন ছিল না… গত পাঁচ বছর ধরে একই লোক কাজ করছে… এতদিনে খুব ভালো বুঝে গেছে কি চাই। পাড়ার বাচ্চাদের নাটক… মা বাবা রা তো আসবেই, বাড়ীতে অন্য কেউ থাকলে তারাও আসে। মোটামুটি ছটার মধ্যে স্টেজের সামনের চেয়ারগুলো দখল হয়ে গেছে। ঠিক সাড়ে ছ টাতেই শুরু হল নাটক, তার আগে কালচারাল প্রোগ্রামের সেক্রেটারী হিসেবে শুভকে ছোট করে একটা বক্তব্য রাখতে হয়েছে…আজ থেকে তিন দিনের প্রোগ্রাম নিয়ে।নাটকের প্রথম দৃশ্য ঠিকঠাক মতো হয়ে গেলে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করল… মোটামুটি নয়… বেশ ভালোই অভিনয় করেছে সবাই। বাকিটা নিশ্চয় ভালোই করবে মনে হচ্ছে…ভেবে স্টেজের পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়ল। একটু একটু করে নাটক এগোচ্ছে… দর্শকদের অভিব্যাক্তি বলছে খুব ভালো হচ্ছে।ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলো যে এত সুন্দর অভিনয় করতে পারবে কেউই বোধ হয় ভাবতে পারেনি। পৌনেআটটায় নাটকের শেষ দৃশ্যের পর হাত দর্শকদের হাততালি যেন শেষ হতে চায় না… শেষ পর্যন্ত নাটকের সব বাচ্চাদের স্টেজে নিয়ে এসে পুজো কমিটির সেক্রেটারী, সুধন্য বাবু নিজের বক্তব্য শুরু করলেন… এত সুন্দর একটি নাটক দেখার সুযোগ করে দেবার জন্য আমাদের এলাকার স্বনামধন্য শিক্ষক অরুনাভ স্যরের নাতি অরিত্র ও আমার ভাইপো শুভর কাছে এবং যে সমস্ত ছোটোছোটো ছেলে মেয়েরা অংশ গ্রহন করেছে তাদের সবার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। সত্যি কথা বলতে কি আমি নিজেই বারন করেছিলাম এত ছোটো বাচ্চাদের কে নিয়ে নাটক না করার জন্য… আমি যে ভুল ছিলাম সেটা ওরা সবাই প্রমান করে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে ইচ্ছে থাকলে সব কিছুই করা সম্ভব।আপনারা সবাই নাটক টি দেখে নিশ্চয় বুঝেছেন… সত্যিকারের ইচ্ছে থাকায় কি ভাবে একটি সহায়সম্বলহীন ছেলে কিভাবে নিজের চেস্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছে, শুধু তাই নয় ভালো রেজাল্টও করেছে। আমি আশা করবো… আমাদের এলাকার ছেলেমেয়েরা যাদের সব কিছুই আছে…তারা নাটকটি দেখে উদুব্ধ হবে। আমি অরিত্র ও শুভ কে অনুরোধ করছি…দুজনেই যদি এখানে এসে আমাদের সবার অভিনন্দন গ্রহন করে। অরিত্র আর শুভ স্টেজের পাশে দাঁড়িয়েছিল… অরিত্র বরাবরই কিছুটা মুখচোরা…পেছনে থেকে সব কিছু করবে কিন্তু সামনে আসতে পারেনা…শুভ আবার ঠিক বিপরীত… জেঠুর কাছ থেকে মাইক্রোফোন টা নিয়ে বলতে শুরু করল… আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ আমাদের উতসাহ দেবারজন্য। আমার মতে অরিত্রর পাওনাটাই বেশি…আমি শুধু ওকে কিছুটা সাহায্য করেছি মাত্র। আপনারা যে নাটকটি দেখলেন তা কোনো কল্পনা নয়…সত্যি ঘটনার উপরে লেখা… অরিত্র আর আমি বছর দুয়েক আগে বীরভুম বেড়াতে গিয়েছিলাম… ওখানে আমরা এক চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে দোকানের ছেলেটির সাথে কথা বলে জানতে পারি… ওর বাবা প্রায় দু বছর নিরুদ্দেশ…বাড়ীতে দুটো ছোট ছোটো ভাইবোন,দাদু, ঠাকুমা… সাহায্য করার কেউ নেই…ছেলেটি ওর মায়ের সাথে মিলে ছোট্ট চায়ের দোকান চালিয়ে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। ছেলেটির ইচ্ছা দেখে আমরা দুজনে কিছু সাহায্য করা শুরুকরি… ছেলেটি এই বছর মাধ্যমিক পাশ করেছে ৯০% মার্ক্স পেয়ে যা কি না যে সমস্ত ছেলে মেয়ে সমস্ত সুযোগ সুবিধা পায় তারাও সহজ়ে করতে পারে না। ছেলেটির পড়াশোনা যাতে আর বাধা নাপায় তার জন্য আমরা আমাদের ক্লাবের তরফ থেকে ওর পড়াশোনার সমস্ত ভার নিয়েছি এবং সাথে সাথে এই বছর থেকে যাতে আরো এই রকম মেধাবী দরিদ্র ছেলে মেয়েদের সাহায্য করা যায় তার জন্য আলাদা একটা ফান্ড আমরা তৈরী করেছি। আশাকরি আপনাদের সবার সাহায্য আমরা পাবো।

বাইরে যাবার প্রোগ্রামটা একটু পালটে নিয়ে…মৌ কে নিয়ে সপ্তমীর রাতেই বেরোবে ঠিক করে নিয়ে শুভকে বাকি সময়টা দেখে নিতে বললে শুভ এক কথায় রাজী হয়ে গেল। মৌ এর ব্যাপার টা মোটামুটি ওর জানা ছিল। মজা করে বলল… কি গুরু…শুধু প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা নাকি… আরো কিছু আছে?

কি আবার থাকবে? তুই ও যেমন…কিছু করার ইচ্ছে থাকলে বাইরে যাবো কেন…

কে জানে বাবা… তুই কেমন করে নিজেকে সামলে রাখিস… আমি হলে তো কবেই… আর কিছু না হোক…

অরিত্র হেসে ফেলে বলল… থাক আর এগোস না… এই জন্যই তো তোর সাথে আমার এত বন্ধুত্ব… একেবারে উলটো বলেই বোধ হয় এত টান…

তা যা বলেছিস… আচ্ছা…যা…যেতে হবে যখন দেরী করিস না… আমি এদিকটা সামলে দিচ্ছি…চিন্তা করিস না।

তুই কবে বেরোচ্ছিস?

দাঁড়া…আমার প্রানেশ্বরী এখোনো নাকি বাড়ীতে ম্যানেজ করে উঠতে পারেন নি…

সে কি রে… সেদিন যে বললি বাড়িতে জানিয়ে দেবে…

আরে বললেই কি আর বলা যায় নাকি? ওর বাবা কে তো চিনিস… বাঘের বাচ্চা…বলতে গিয়েও ব্যাক গিয়ার দিয়ে দিয়েছে…

তুই কাকুকে দিয়ে বলাচ্ছিস না কেন? বাড়ীতে বলিসনি নাকি?

মা কে একটা আভাস দিয়ে রেখেছি…দেখি তাই করতে হবে… আর ভালো লাগছে এই ভাবে লুকোচুরি খেলতে…

ঠিক আছে চল… কাল সকালে তোদের বাড়ী যাচ্ছি… চিন্তা করিস না…কাকীমা কে দিয়ে কাকুকে ঠিক ম্যানেজ করে নেবো…আসি রে…

দিদানরা কিছুক্ষন আগেই নাটক দেখে ফিরে এসেছে… নাটক চলাকালীন ওখানেই দিদান কে বলে দিয়েছিল আজকেই মৌ কে নিয়ে বেরোবে। মৌ একাই বেরোবে বলে তৈরী হচ্ছে…আজ তো আর রুপসা নেই যে সাজিয়ে দেবে…শুক্লাদি কিছুক্ষন পর অরিত্র কে ডেকে বলল… গিয়ে দেখ… চুপ করে বসে আছে… কি পরবে ঠিক করতে পারছে না।

তুমি দেখে দাও না…আমি আবার কি করবো গিয়ে…

শুক্লাদি হেসে ফেলে বলল…দিয়েছিলাম…কোনোটাই পছন্দ নয়…তুই গিয়ে দেখ।

ঠিক আছে চলো।

ওর ঘরে গিয়ে দেখা গেল যতজামাকাপড় ছিল সব বিছানায় ছড়ানো…এক পাশে মুখ ভার করে বসে আছে। অরিত্র কে দেখতে পেয়েই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল… যেন বোঝাতে চাইলো… তুমি এসে গেছো? কি পরবো দেখে দাও না…

সব গুলোই খুব সুন্দর…বাছাবাছির তেমন কিছু নেই দেখে দু একটা দেখে নিয়ে একটা জমকালো দেখে কিছু একটা তুলে হাতে দিলে খুব খুশী…অরিত্র নিজেও জানে না ড্রেসটার কি নাম…সাউথ সিটি মলে গিয়ে ভালো লেগেছিল বলে মৌ আর দু বোনের জন্য একই জিনিষ নিয়েছিল…আজকাল মেয়েদের কতরকম নতুন নতুন ডিজাইনের ড্রেসআসছে যে নাম মনে রাখা মুশকিল…তার উপরে এতদিন এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারই পড়েনি… মৌ একবারের জন্যও দেখলো না ওকে কেমন লাগবে…হাসি মুখে বোঝালো…এটাই ঠিক আছে।

শুক্লাদি পাশ থেকে হেসে ফেলে বলল… কি রে মৌ…একটু আগেই তো আমিও দিয়েছিলাম… তখন তো মাথা নেড়ে এমন করে না বললি যে…মনে হচ্ছিল ওটার থেকে খারাপ আর কিছু হয় না।

লাজুক একটা মিষ্টি হাসিতে বোঝালো… তোমার দেওয়া আর ওর দেওয়া কি এক? ও যা দেবে সেটাই সব থেকে ভালো।

শুক্লাদি বুঝতে পেরে ওকেজড়িয়ে ধরে বলল…বুঝেছি…যা…তাড়াতাড়ি পরে নে… আর কখন বেরোবি।
নবমী অব্দি কিভাবে কেটে গেল বোঝা গেল না…পূজো আসছে ভাবতে কত ভালো লাগে…কিন্তু কি করে যে চারটে দিন কেটে যায় কে জানে।আজ বিজয়া দশমী…পাড়ার অনেকেই বাইরে কোথাও বেরোবে বলে বিসর্জন একটু তাড়াতাড়ি সেরে নেওয়া হয়। সন্ধের মুখে দিদানের সাথে মৌ সিন্দুর খেলা দেখতে গেছে, অরিত্র শরীর টাভালো ছিল না বলে বাড়ী থেকে বেরোয় নি…ড্রয়িং রুমে দাদুর সাথে বসে টিভিতে পুজো পরিক্রমা দেখছিল, আটটা নাগাদ ওরা ফিরলো…দিদানের মতো মৌ এর ও সারা মুখে সিন্দুর মাখানো। দাদু দিদান আর শুক্লাদিকে বিজ়য়ার প্রনাম করে শরীর টা ভালো লাগছে না…একটু শুয়ে নি বলে ও উপরে গিয়ে নিজের ঘরে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষন পর কপালে কারুর হাতের ছোঁয়া পেয়ে তাকিয়ে দেখে মৌ, ওর দিকে তাকিয়ে আছে…চোখে মুখে কিছুটা চিন্তার ছাপ…যেন বলতে চাইছে…খুব শরীর খারাপ লাগছে?

ওর হাতটা ধরে নিজের গালে আলতো ভাবে চেপে ধরে বুকের ভেতরটা যেন অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ভরে উঠল…ওর টুকটুকে ফর্সা মুখে লাল সিন্দুরের দাগ…ওকে যেন আর মোহময়ী করে তুলেছে… খুব ইচ্ছে করছিল… বুকে টেনে নিয়ে জ়ড়িয়ে ধরে আদর করে বলতে…তোমাকে একান্ত ভাবে নিজের করে নিতে চাইছি…কিন্তু পারছিনা…তুমি কি বুঝতে পারছো? না বলা কথা গুলো নিজের ভেতরে চেপে রেখে মুখে হাসি এনে বলল…তেমন কিছু হয় নি…রাতে ভালো করে ঘুমোলে ঠিক হয়ে যাবে।

মৌ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে কি বুঝলো কে জানে…ইশারা করে বোঝালো ও বিজয়ার প্রনাম করতে চায়।

এই দেখো…আমাকে আবার কেন?

আবার ইশারা করে বোঝালো…ওকে প্রনাম করতে দিতেই হবে।

মৌ ওর পা ছুঁয়ে প্রনাম করে উঠে দাঁড়ালে ওর কাঁধে হাত রেখে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল…প্রনাম তো করলে…কিন্তু কি বলে তোমাকে আশীর্বাদ করি বলতো। মৌ চোখ বুজে থেকে একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে যেন বোঝাতে চাইলো…আমার যে তোমাকে ছাড়া আর কিছু চাই না…আমি কি চাই তা কি তুমি কোনোদিনও বুঝেও বুঝবে না?

পরের দিনটা শুরু হল বাকি আর পাঁচটা বিজয়া দশমীর পরের দিন হিসেবে। ফোন আর এসএমএসে বিজ়য়া দশমীর শুভেচ্ছা আদান প্রদান চলছিল সকাল থেকেই। যারা বাড়ীতে আসার তারা আর একটু পর থেকেই আসতে শুরু করবে। অরিত্রর শরীর মোটামুটি ভালোই। দশটা নাগাদ নারায়নদা নাতনী প্রিয়া কে সাথে নিয়ে প্রতি বছরের মতো একটা মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে হাজির। প্রিয়া ওর দাদুর মুখে মৌ এর ব্যাপারে শুনেছিল কিন্তু এই প্রথম নিজের চোখে দেখলো। মৌ কে দেখার পর থেকেই প্রিয়া চিন্তা করছিল…কোথাও যেন ওকে দেখেছে কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না। হঠাত মনে হল…কলেজে দেখেনি তো? সপ্তাহে একদিন ও অনেক সকালে টিউশান পড়তে যায় কলেজের এক স্যারের কাছে। কলেজ থেকে খুব বেশী দুরে নয় বলে টিউশান থেকে বেরিয়ে যখন কলেজে আসে তখনও মর্নিং সেকশানের ক্লাস শেষ হতে কিছুটা বাকি থাকে বলে কলেজের সামনে অপেক্ষা করতে হয়। মনে হয় মর্নিং সেকশানের ছুটির পর ওকে দেখেছে কিন্তু ঠিক কিনা বুঝতে পারছে না। হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। বাড়ী ফিরে দাদুকে বলতেই দাদু ওকে একটু বকাবকি করল…কেন তুই ওখানেই বলিস নি…জানিস অরিত্র দাদাভাইরা কত চেষ্টা করেছে মৌ দিদি কে জানার জন্য। সাথে সাথেই আবার নারায়নদা ফিরে এল প্রিয়া কে সাথে নিয়ে। মৌ নিচে না থাকায় ওদের সুবিধা হল ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে, মোটামুটি প্রিয়ার কাছ থেকে যেটুকু জানা গেল তাতে বিশেষ কিছু বোঝা না গেলেও একটা আশার আলো দেখা গেল। হয়তো কলেজে গিয়ে খোঁজ নিলে কিছু জানা যেতে পারে কিন্তু কলেজ খুলতে তো সেই লক্ষী পূজোর পর, এই কটা দিন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো গতি নেই। দাদু এক ফাঁকে বিশ্বাস কাকুকে ফোন করে মোটামুটিভাবে বুঝিয়ে দিল। যে কেউ গেলে তো আর কলেজ কতৃপক্ষ কোনো কথা বলবে না, পুলিশকে দিয়েই খোঁজ নিতে হবে। আর একটা রাস্তা আছে, কলেজ ইউনিয়ান থেকে খোঁজ পাওয়া যেতে পারে কিন্তু সে ও তো কলেজ খোলার আগে সম্ভব নয়। বিশ্বাস কাকু ছুটি নিয়ে বাড়ী এসেছে দেখে মৌ এর একটা ফোটো নিয়ে অরিত্র এক ফাঁকে দিয়ে এল। মনের ভেতরে ভীষন তোলপাড় হচ্ছিল, এবারে হয়তো কিছু একটা জানা যাবে। রুপসা আর পুবালীকে ফোন করে জানাতে ওরা তো প্রায় লাফিয়েই উঠল, দুজনেই জানে মৌ এর পরিচয় না জানায় অরিত্র চাইলেও এগোতে পারছে না।
প্রতি বছরই বেশ কয়েকদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যাওয়া ওদের অনেক বছর ধরে চলছে, চাকরী পাবার আগে দাদুই নিয়ে যেত আর এখন যেহেতু ও নিজে খরচ করতে পারে তাই দাদুকে খরচ করতে দেয় না।এবারেও যাবার সব কিছু ঠিক করা আছে। লক্ষী পুজোর পরদিন বেরিয়ে দার্জিলিং আর গ্যাংটক হয়ে ফিরবে, আগেও দুবার গেছে কিন্তু সব জায়গা গুলো এখোনো দেখা হয়ে ওঠেনি। দিদানের প্লেন চড়তে খুব ভয় থাকায় ট্রেনেই যাওয়া আসা করতে হবে না হলে বাগডোগরা পর্যন্ত প্লেনে যাওয়া আসা করা যেত। মৌ এর ব্যাপারে খোঁজ নেবার জন্য নিজ়ে কোলকাতায় থাকলে ভালো হ’ত কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই, বিশ্বাস কাকুর সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখতে হবে। বেড়াতে যাবার আগে কয়েকটা দিন অফিস করতে একেবারেই ভালো লাগছিল না, আশা নিরাশার দোটানায় মনের ভেতরে ভীষন একটা অস্থিরতা…কি হবে…যদি কিছু না জানা যায়। বাড়ীতে ফিরে নিজের মনের অবস্থাও চেপে রাখতে হচ্ছে…মৌ কে কোনোভাবেই বুঝতে দেওয়া যাবে না। ডাক্তার বার বার সাবধান করে দিয়েছিল…কোনোভাবেই ও যেন কোনো মানসিক চাপের মধ্যে না থাকে…তাতে আরো খারাপ হলেও হতে পারে। এই রকম একটা অবস্থার মধ্যে বেরোনোর জন্য গোছগাছ চলছিল, বাইরে যাওয়া তো নয় যেন দক্ষযজ্ঞ, শুধু তো আর জামাকাপড়নিয়ে বেরিয়ে পড়লে হবে না, দাদুদের প্রেসক্রিপশান, ওষুধ, হটব্যাগ, তার সাথে একটা জিনিষতো চাই ই চাই দাদুর, টি পট নিতেই হবে, দাদুর আবার দার্জিলিং ফ্লেভার ছাড়া চলে না। যদিও দিদান আর শুক্লাদি এসব ব্যাপারে ভুল করেনা তবুও অরিত্র নিজে একবার দেখে নেয়। মৌ বেড়াতে যাওয়া হবে বলে ভীষন খুশী, দিদান আর শুক্লাদির সাথে সব সময় থেকে অনেকটাই সাহায্য করছে গোছগাছ করতে।

মোটামুটি ভালো ভাবেই ওরা দার্জিলিং পৌঁছে গেছে।রাতের ট্রেন জার্নি আর পরের দিন পাহাড়ী রাস্তায় গাড়ী করে এসে সবাই বেশ ক্লান্ত বলে প্রথম দিন আর কোথাও না বেরিয়ে বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন থেকে শুরু করা হবে ঠিক হল। এমনিতেও তাড়াহুড়োর কিছু নেই, ধীরে সুস্থে যাতে ঘোরা যায় তার জন্য হাতে এক দিন বেশি রেখেই হোটেল বুক করা আছে। সন্ধের দিকে ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল, সবাই ঘুমোচ্ছে দেখে অরিত্র একটা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। পাহাড়ী রাস্তায় বৃষ্টির মধ্যে কিছুক্ষন এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে এসে দেখল তখোনো কেউ ওঠেনি। ঠান্ডাও বেশ জমিয়ে পড়েছে দেখে হোটেলের বারে গিয়ে এক পেগ হুইস্কি নিয়ে বসার পরই বিশ্বাস কাকুর ফোন এল। বিস্বাস কাকু নিজেই গিয়েছিলেন কলেজে,পুলিশ বলে পরিচয় দেওয়াতে কাজও হয়েছে। প্রিন্সিপাল ছবি দেখে চিনতে না পারলেও দুজন অফিস স্টাফ মোটামুটি একটা আভাস দিয়েছেন যে মেয়েটি ওই কলেজেরই ছাত্রী ছিল, খুব সম্ভবত গত বছরই বিএ অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে কিন্তু কাগজপত্র না দেখে বলা সঠিক করে বলা সম্ভব নয়। অফিসের কাগজপত্র খুঁজে নাম ঠিকানা বের করে দেখার জন্য আগামীকাল আবার যেতে অনুরোধ করেছেন উনারা। বুকের ভেতরে একটা আশার আলো নিয়ে ওদের দু বোনকে কন কলে নিয়ে জানালো কতটা কি হয়েছে। ওদের সাথে কিছুক্ষন কথা বলে পেগটা শেষ করে উঠবে ভাবছিল এমন সময় রিশেপশানের দিকে চোখ পড়ল, মৌ এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে যেন খুঁজছে, ওকেই খুঁজছে বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি উঠে যেতেই ওকে দেখতে পেয়ে সারা মুখে যেন খুশী উছলে উঠল আর তার সাথে দু চোখে বকুনি দেবার ইচ্ছে…কোথায় ছিলে তুমি…কখন থেকে খুঁজছি তোমাকে। ওর হাত ধরে ফিরে এসে বসতে বললে…এদিক ওদিক তাকিয়ে দু চোখে অবাক জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকালো…তুমি এখানে কি করছো…তুমি আবার এই সব খাও নাকি?

অরিত্র ওর চোখে চোখ রেখে আস্তে আস্তে বলল…আগে বোসো…বলছি।

মৌ অনিচ্ছা সত্বেও বসার পর গায়ের শালটা একটু ঠিক করে নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো…দু চোখে সেই একই জিজ্ঞাসা নিয়ে।

অরিত্র ওর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল…আমি সব সময় খাই না…অফিসের পার্টি থাকলে একটু আধটু খেতেই হয়…না হলে খারাপ দেখায়…আর…এমনিতে আমার প্রেসার কম বলে হয়তো… একটা কি বড় জোর দুটো পেগ খেলেই…বেশ ঘুম ঘুম ভাব এসে যায় … তার বেশী খেলে কষ্ট হয় বলে আর খাই না…দাদুরা জানে…

আস্তে আস্তে ওর মুখ থেকে অবাক জিজ্ঞাসা কেটে গিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার ভাব ফিরে এলে…গ্লাসটা দেখিয়ে ইশারা করে বোঝালো…এটাই শেষ?

অরিত্র হাসি মুখে জবাব দিল…হুম…এটাই প্রথম…আর এটাই শেষ…বুকের ভেতরে আরো একটা না বলা কথা ঝঙ্কার দিয়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইলো…ঠিক তোমারই মতো…তুমিই প্রথম…তুমিই শেষ…আমার জীবনে। ইচ্ছে তো হয় বলতে কিন্তু এখনই পারবোনা…ভাবতে ভাবতে বলল…তুমি একটা জুস নাও…আমি ততক্ষনে আমারটা শেষ করে ফেলি।

মাথা নাড়িয়ে জানালো…আচ্ছা।

ওয়েটারকে ডেকে জুস দিতে বলে ওর গায়ের শালটার দিকে তাকিয়ে খুব চেনা চেনা লাগলো, মায়ের বিয়ের আগের খুব প্রিয় একটা দামী কাশ্মীরী হাতের কাজ করা টকটকে লাল শাল, দিদান খুব যত্ন করে এত বছর রেখেছে। নিজের একমাত্র মেয়ের প্রিয় শালটা এতদিন স্মৃতি হিসেবে রাখার পরেও আজ দিদান কি ভেবে ওকে দিয়েছে বুঝতে একটুও অসুবিধা হল না কিন্তু বুকের ভেতরে সেই কষ্টটা ফিরে আসতে চাইলে জোর করে আটকে রেখে বলল…তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। মৌ ওর মুগ্ধ চোখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে একটু যেন লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিল…ওরও বুকের ভেতরে একটা ব্যাথা মুচড়ে উঠে বলতে চাইলো…দিদান আমাকে সব বলেছে…এটা তোমার মায়ের খুব প্রিয় ছিল…তুমি নাকি মাঝে মাঝে তোমার বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমোতে…বিস্বাস কর…আমি প্রথমে নিতে চাইনি…বুঝতে পারি দিদান আমাকে কি চোখে দেখতে চায়…না বলতে পারিনি…তাই নিয়েছি…জানি না…নিজের কাছে রাখতে পারবো কিনা…তুমি যদি সেই অধিকার আমায় না দাও…কি করে রাখবো আমার কাছে? কেন জানিনা…তোমাকে ঠিক বুঝতে পারিনা…তুমি কি সত্যিই আমাকে চাও না? বলতে চাইলেও তো সব সময় সব কিছু বলা যায় না…আরো অনেক না বলা কথার মতো এটাকেও বুকে আটকে রেখে লাজুক হাসি মুখে নিয়ে ওর দিকে মুখ তুলে তাকালো…ঠিক যেন বলতে চাইছে…তাই? আমাকে খুব সুন্দর লাগছে?

অরিত্র দু চোখের মুগ্ধতা দিয়ে ওকে স্পর্শ করতে করতে বলল…সত্যিই…তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। মৌ ওর হাতটা ধরে আলতোভাবে চাপ দিয়ে যেন বোঝাতে চাইলো… তোমার চোখ দিয়েই আমি নিজেকে দেখতে চাই সারা জীবন…

পরের দিন সকালে আকাশে আর মেঘ নেই, ভোর রাতে উঠে টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখে দিন শুরু হয়েছে। সত্যিই আজ ওদের কপাল ভালো ছিল…এর আগের বার আকাশে এত মেঘ ছিল যে সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি। ঝকঝকে পরিস্কার আকাশ, পাহাড়ী নরম রোদ মাতাল হাওয়ার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে গা ছুঁয়ে যেন আদর করে যেতে চাইছে। বাতাসিয়া লুপ থেকে চারদিকটা ভীষন ভালো লাগে দেখতে…এমনিতে তাড়াহুড়ো নেই তার উপর দিদান আর শুক্লাদি সেই কখন থেকে সোয়েটার দেখে যাচ্ছে দেখে অরিত্র এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল…দাদুর সাথে মৌ গেছে গাড়ীর দিকে…দাদু সকালের ওষুধটা খেতে ভুলে গিয়েছিল আজ। এগারোটা বেজে গেছে দেখে অরিত্র বিস্বাস কাকুকে ফোন করল কিছু খবর আছে কিনা জানার জন্য। বিশ্বাস কাকু ফোনটা ধরে বলল…অনেক দিন বাঁচবি রে…তোকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম…বল…তোরা কেমন ঘুরছিস? বিশ্বাস কাকুর গলা শুনে মনে হল আজ কিছু ভালো খবর আছে। নিজেই একটা প্রশ্ন করলেও উত্তরের অপেক্ষা না করে কাকু বলল…শোন…অপারেশন মৌ সাকসেসফুল…আজ যাতে আর ঘোরাতে না পারে ভেবে সকাল বেলাতেই চলে গিয়েছিলাম। নাম ঠিকানা সব পাওয়া গেছে। তারপর জোড়াবাগান থানার মেজোবাবুকে পাকড়াও করে ঠিকানা খুঁজে চলে গিয়েছিলাম। ঠিকানাও পাওয়া গেছে কিন্তু বাড়ীতে কাউকে পাওয়া যায়নি।আশেপাশে জিজ্ঞেস করে জানলাম…কোথাও বেড়াতে গেছে…দিন দশেক পরে ফিরবে।

বুকের ভেতরে যতটা আশা জেগেছিল ততটাই নিরাশা ফিরে এল। একই রকম বা অনেকটা মিল আছে চেহারাও মুখের এমন কেউ তো হতে পারে ভেবে বলল…ঠিক জায়গাতে পৌছনো গেছে কিনা তো বোঝা গেল না।

কাকু হয়তো জানতো ও কি বলতে পারে…তাই…আস্বস্ত করে বলল…শোন…এত বছর পুলিশে চাকরী করে কি কিছুই শিখিনি রে…বাজিয়ে দেখে নিয়েছি…পাশের বেশ কয়েকটা বাড়ীর লোকজনের সাথে কথা বলেছি। নর্থ কোলকাতা তো জানিস কি রকম…সবাই সবাই কে চেনে। অনেক বছর ধরে পাশাপাশি থাকলে যা হয়।

কিছু ডিটেলস পেলে?

হ্যাঁ রে পেয়েছি…কিছু নয়…অনেকটাই…ভালো নাম…মৌমিতা গাঙ্গুলী…ডাক নাম…মৌ…আমি তো ডাক নামটা শুনে প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম…তোর দেওয়া নামের সাথে কি করে যে মিলে গেল…যাক গে… গত বছর বি এ অনার্স পাশ করেছে…রেজাল্ট ভালো…স্বভাব চরিত্রও ভালো…কোনো খারাপ কিছু কেউ দেখেনি…তবে বেশ কিছুদিন ধরে দেখতে না পেয়ে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করলে ওর মা নাকি বলেছে বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটিতে এম এ পড়ছে…হোস্টেলে থাকে… বাবা মারা গেছে বছর দুয়েক আগে একটা দুর্ঘটনায়…নিজের মা অনেক আগেই ছোটো বেলায় মারা গেছে…সাডেন হার্ট ফেলিওর…বাবার সেকেন্ড ম্যারেজ এর দিক থেকে এক ছেলে আর এক মেয়ে…ছেলেটা বড়…ভালো নাম আকাশ, ডাক নাম বিল্টু…ক্লাস টেনে পড়ছে…মেয়ের ভালো নাম সম্পূর্না, ডাক নাম মিষ্টি… এখন এইটে পড়ছে…বাবার ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা এখন মা দেখে…টাকা পয়সা মোটামুটি ভালোই আছে…অন্তত…আশে পাশের লোকজনের তাই ধারনা।

তাহলে…কি এমন হতে পারে…যার জন্য হয়তো বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল…বুঝতে পারছি না।

হুম…ঠিকই ধরেছিস…নিশ্চয় এমন কিছু আছে যা আশে পাশের লোকজন জানে না…সেটাই আমাকে খুঁজে বের করতে হবে…কিন্তু এখন আরঅপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই…বাড়ীর লোকজন ফিরুক…তারপর দেখছি কি করা যায়…ভেতরের খবর বের করতে হলে একটু বেগ পেতে হবে মনে হচ্ছে। মা আছে কিন্তু নিজের নয়, দু দুটো ভাই বোন…বাবা নেই…সম্পত্তির অধিকার থেকে হটানোর একটা গন্ধ পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে। যাক গে…তোরা ভালোভাবে ঘুরে আয়…দাদুদের কে জানাস…আমি আর আলাদা করে ফোন করছি না…বুঝলি?

হ্যাঁ ঠিক আছে…কাকু তোমাকে কি বলে যে thanx জানাবো…

ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কাকু বলল…শোন…আমাকে তোর আর ওইসব জানিয়ে নিজেকে ছোটো করিস না…তোর দাদু দিদান আমাদের জন্য যা করেছে তা আমরা কোনোদিন ভুলতে পারবো না। এতদিন পর তোদের জন্য কিছু একটা করতে পেরে মনে হচ্ছে কিছুটা হলেও ঋন মুক্ত হতে পারবো। আর শোন…ভালো কথা…মেয়েটাকে একা একা একদম ছাড়বি না…বলা যায় না…নিশ্চয় খারাপ কিছু উদ্দেশ্য আছে…গুন্ডা লাগিয়ে কিছু একটা করতে পিছপা হবে না…না হলে মেয়েটা নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পর পুলিশের কাছে কেন যায়নি… টাকাপয়সা খুব খারাপ জিনিস…বুঝলি…নিজের বাপ ছেলেকেও খুন করতে পিছপা হয় না…আর এ তো…নিজের মা নয়। পুলিশের চাকরী করতে গিয়ে যে কত কিছুর সামনা করতে হয় সে আমি হাড়ে হাড়ে জানি।

বুকের ভেতরে একটা ঠান্ডাস্রোত বয়ে গেল…তবুও নিজেকে ঠিক রাখার কিছুটা চেষ্টা করে বলল…ঠিক আছে কাকু…এমনিতে ও বাইরে একা কোথাও যায় না…গেলেও আমরা কেউ না কেউ সাথে থাকি।

ঠিক আছে…এখন রাখ…বেশি চিন্তা করিস না…আমি বরং দার্জিলিং থানায় একবার ফোন করে দিচ্ছি…তোদের উপর যেন একটু নজর রাখে।ওখান থেকে গ্যাংটক যাবার আগে একবার জানিয়ে দিস…ওখানেও বলে রাখবো। আর শোন…এত কিছু দাদুদেরকে বলিস না…বুড়ো বয়সে চিন্তা করতে গিয়ে আবার কিছু না হয়ে যায়।

এতদিন বুকের ভেতরে যে চিন্তাটা ছিল সেটা কাকুর কাছ থেকে খবর পাবার পর অনেকটাই ঠিক হয়ে গেলেও…নতুন এক চিন্তা বুকের ভেতরটা তোলপাড় করতে শুরু করে দিয়েছে। হঠাত মনে পড়ল…ও দাদুর সাথে গাড়ীর দিকে গেছে…এখোনো ফেরেনি…তাড়াতাড়ি দিদানরা কোথায় আছে দেখে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে গিয়ে বুকে প্রান ফিরে এল…মৌ*…দাদুর হাত ধরে উপরের দিকে আসছে…দাদু কিছু একটা বললে সারা মুখে লাজুক হাসি ছড়িয়ে দাদুর হাত ছেড়ে দিয়ে যেন বলতে চাইছে…যাও…তোমার সাথে আড়ি…

দাদু দাঁড়িয়ে পড়ে আবার কিছু একটা বললে…ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে যেন বলতে চাইছে…হ্যাঁ…
এত সুন্দর একটা নিস্পাপ মেয়ের কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে বিশ্বাস করা খুব কঠিন ভাবতে ভাবতে আশে পাশে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল…কেউ সেভাবে ওর দিকে নজর রাখছে কিনা। নাঃ… কিছু বিভিন্ন বয়সের মানুষ যারা সুন্দরী মেয়ে দেখলে দু চোখ দিয়ে গিলতে চায়…সেই রকম কয়েক জন ছাড়া সে রকম কিছু চোখে পড়ল না। বাকিরা নিজেদের নিয়ে ব্যাস্ত। এত বড় একটা খবর দাদুদের কে না দেওয়া পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিল না কিন্তু ওর সামনে তো বলা যাবে না দেখে ইচ্ছে করেই মৌকে দিদানদের কাছে দিয়ে এসে দাদুকে মোটামুটি যতটা বলা যায় বলে ওদের দু বোন কে ফোন করল…

রুপসা চুপচাপ শোনার পর জিজ্ঞেস করল…তো…দাদাভাই…এবারে কি?

এবারে কি মানে?

ধুস…তুই না…একটা যাচ্ছেতাই…তোর একটা প্রশ্নের তো উত্তর পেয়ে গেছিস…

ওর সাথে এখন কথা বাড়িয়ে লাভ নেই দেখে বলল…আমি এখন ওসব নিয়ে কিছু ভাবছি না…কাকু আগে বাকি খবর গুলো নিক…

হুম…তবে তাই হোক…আমি কিন্তু বলে দিচ্ছি দাদাভাই…তুই যদি আর কাউকে বিয়ে করিস…দেখে নিস কি করি…তোর সাথে আর কোনোদিন কথাই বলবো না।

বোনটা সত্যিই পাগল…কিছু বুঝতে চায়না ভেবে বলল…আচ্ছা ঠিক আছে…চল…বিয়ে যদি করতেই হয় ওকেই করবো…আর না হলে কাউকেই নয়…তাহলে হবে তো?

কি আর করবো বল…তুই তো আর আমি নই…এই ছোড়দি…তুই আছিস লাইনে? কিছু বল না…

পুবালী কিছু না বলে চুপচাপ ওদের কথা শুনছিল…রুপসার কথা শুনে বলল…ভাই ঠিকই বলেছে…এখনই সব কিছু ভেবে নেওয়াটা ঠিক হবে না…

ওর কথা শেষ হতে না হতেই রুপসা বলে উঠল…ঠিক আছে…ঠিক আছে…চল…তোরা সব গোমড়ামুখো হুতুম প্যাঁচার দল…সব সময় এটা কি হবে…ওটা কি হবে…এই নিয়েই আছিস…আমি আর কিছু বলবো না …যা…আমার বয়ে গেছে…যেন ওর সাথে বিয়ে হলে আমার কিছু লাভ আছে…একটা মাত্র দাদাভাই…ভালোবাসি…তাই বলি…না হলে আমার কি আসে যায়। এই…ছোড়দি…রাখছি এখন…পরে ফোন করিস।

রুপসা অভিমান করে ফোনটা কেটে দিলে পুবালী বলল…ভাই…মন খারাপ করিস না…মাথা গরম হয়ে গেছে…তোকে ফোন করতে হবে না…ওই দেখবি নিজেই ফোন করবে…আমি তো চিনি ওকে…দাদাভাই বলতে পাগল…নিজেকেও বোধহয় এত ভালোবাসে না।

জানি…আচ্ছা…রাখি রে এখন…রাতে ফোন করবো।

পুবালির লাইনটা কাটতেই সাথে সাথে একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলে ধরবে কি ধরবে না ঠিক করতে পারছিল না…কিছুক্ষন রিং হওয়ার পর কি মনে করে ধরলে ওদিক থেকে জিজ্ঞেস করল…আমি কি অরিত্র সেন এর সাথে কথা বলতে পারি?

আমিই অরিত্র…বলুন।

আমি রঞ্জন দাশগুপ্ত… দার্জিলিং থানা থেকে বলছি… মিঃ বিশ্বাস আপনার ব্যাপারে এখুনি ফোন করেছিলেন।

ও আচ্ছা…হ্যাঁ…বলুন…আমার সাথে একটু আগেই ওনার কথা হয়েছে।

মিঃ বিশ্বাস…সব কিছু বলেছেন…আমরা আছি…চিন্তা করবেন না…আপনাদের হোটেলের নাম, রুম নাম্বার আর গাড়ীর নাম্বারটা দিন…আমি প্লেন ড্রেসে একজন কে আর্মস দিয়ে পোস্টিং করে দিচ্ছি…খুব কাজের ছেলে…কিছু মনে হলেই সাথে সাথে আমার এই নাম্বারে ফোন করবেন…

গাড়ীর নাম্বারটা শুনেই বললেন দুধ সাদা টয়োটা তো? ড্রাইভার কে আছে? পবন বাহাদুর? বেঁটে গোলগাল চেহারা…ডান গালে একটা ছোটো কাটা দাগ আছে?

হ্যাঁ… বলাতে বললেন…আরো ভালো হল…ছেলেটার সাথে আমাদের ভালো যোগাযোগ আছে…ওকেও একবার ফোন করে নিচ্ছি…আমার অর্ধেক কাজ ওকে দিয়েই হয়ে যাবে…একাই পাঁচটা লোকের মহড়া নেবার ক্ষমতা আছে ওর।

এত কিছু জানলেন কি করে জিজ্ঞেস করাতে বললেন…আরে মশাই…আমরা পুলিশের লোক…সবাই কে জানতে হয়…কখন কাকে কি কাজে লাগে কে জানে…হো হো করে হেসে উঠে বললেন…আপনারা তো ভাবেন পুলিশ মানেই কিছু করে না…অপদার্থ…ঘুষ খায়…

তা অবশ্য ঠিক…খবরের কাগজ আর টিভিতে যা দেখি…অবশ্য মাঝে মাঝে পুলিশের মানবিক দিকটাও খবরে আসে…

যাক গে…আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন…আমার আবার একটু বেরোতে হবে… চা বাগানে একটা হাফ মার্ডার কেস হয়েছে…দারু গিলে মেয়ে নিয়ে মারামারি…আর ভাল্লাগে না…সারাদিন এইসব কেস ঘেঁটে ঘেঁটে… নিজে যে ভদ্রলোকের ছেলে ভুলেই গেছি…

ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে দিদানদের ডাকতে গিয়ে খেয়াল হল…এই যাঃ…ওনার পরিচয়টা তো জানা হল না…কি ভাবলো কে জানে…ঠিক আছে পরে একবার ফোন করে কথা বলে নেওয়া যাবে ভেবে এগিয়ে যেতে গিয়ে দেখলো…দাদু ওদের কে নিয়ে আসছে।সবার হাতেই একটা করে বড় প্যাকেট…আবার এক গাদা সোয়েটার কিনেছে নিশ্চয়…কি করবে কে জানে…বললেও শোনে না। নিচে নেমে গাড়ীর কাছে গিয়ে পৌঁছোলে পবন তাড়াতাড়ি এসে গাড়ীর দরজা খুলে দিলে এক এক করে সবাই উঠে পড়লে জিজ্ঞেস করল…

সাব…আভি কাঁহা যানা হ্যায়…

দাদু হোটেলের দিকে ফিরতে বলল…বেলা হয়ে গেছে…স্নান খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরোনো যাবে। হোটেলের সামনে পৌঁছোনোর পর পবন কিছুতেই সোয়েটারের প্যাকেট গুলো কাউকে নিতে দিল না…ও পৌঁছে দেবে। ছেলেটা সত্যিই খুব ভালো…প্রথম থেকেই খুব খাতির যত্ন করছে। অরিত্র সবাই চলে যাবার পর কি কি নিতে হবে দেখে নিয়ে এগোতে গেলে পবন বলল…

সাব…থোড়া রুকিয়ে…আপকে সাথ বাত হ্যায়…

অরিত্র দাঁড়িয়ে গিয়ে ওর দিকে তাকালে…পবন প্যাকেট গুলো আবার গাড়ীতে রেখে বলল…সাব…থানা সে বড়া সাবজী কা ফোন আয়া থা…আপলোগ উনকা মেহমান হ্যায়…হামকো পাতা নেহি থা…বড়া সাবজী ভাবীজী কা বারে মে মেরেকো বাতায়া…আপ চিন্তা মত কিজিয়ে…ম্যায় যব তক জিন্দা হুঁ…কিসিকা দম নেহি হ্যায় ভাবীজী কো ছুঁনে কা…আপলোগ ইতনা আচ্ছা আদমী হ্যায়…আপলোগোকে লিয়ে কুছ করনে কা মওকা মিলনা ভি বড়ী বাত হ্যায়…কিতনা আদমী আতা হ্যায়…সব হাম জ্যায়সা ছোটা আদমী কো কিতনা বুরা নজরসে দেখতে হ্যায় লেকিন আপলোগ কিতনা পেয়ার হামকো দে রহে হ্যায়…আপনা ঘরকা আদমী য্যায়সা…হাম কভি…আপ লোগোকো নেহি ভুলেঙ্গে…

ও যে মৌ এর কথা বলছে বুঝতে অসুবিধা হোলো না…যা ভাবছে ভাবুক…এখন আর ওর ভুল ভাঙ্গিয়ে লাভ নেই…বড় বাবু কতটা কি ওকে বলেছে জানেনা…যদি দাদুদের সামনে আবার কিছু বলে বসে এই ভয়ে ও পবন কে বলল…আপ…মেরা ঘরবালো কো কুছ মত বাতানা…ঠিক হ্যায়?

হাঁ সাব…বড়া সাব ও ভি বাতায়া।সমঝমে নেহি আতা হ্যায়…ভাবীজী ইতনি পেয়ারী হ্যায়…উনকি নুকসান কৌন কিঁউ করনা চাহাতা হ্যায়…

ওহি তো বাত হ্যায়…

সাব…অউর এক বাত সমঝ মে নেহি আতা হ্যায়…ভাবীজী ইতনা খুশ রহতী হ্যায়…লেকিন কভি বাত কিঁউ নেহি করতি।

অরিত্র একটু চুপ করে থেকে বলল…ও বাত নেহি কর সকতী…মতলব…করতি থি…লেকিন আভি…

পবন যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না…কেয়া বোল রহে হ্যায় সাব…মেরেকো বিসওয়াস নেহি হো রাহা হ্যায়… পাতা নেহি…আচ্ছা আদমীকো ভগওয়ান কিঁউ ইতনা দুখ দেতি হ্যায়…আপ এক কাম কিজিয়ে না সাব…ভাবীজী কে লিয়ে মহাকাল মন্দীরমে পুজা দিজিয়ে…ভাবীজী ঠিক হো জায়েগি…

ঠিক হ্যায়…কাল জায়েঙ্গে।

পবন খুব খুশী হয়ে বলল…হাঁ…সাব…হামভি পুজা দেঙ্গে। আপ দেখ লিজিয়ে…ভাবীজী ঠিক হো জায়েগী…ফির সে বাতে করনে লাগেগী। ভাবীজীকা আওয়াজ জরুর বহুত মিঠা হোগী।

উপরে গিয়েও পবন আরো একবার পুজো দেবার কথা তুললো দিদানের কাছে…ওকে দেখে মনে হচ্ছিল…যেন ওর নিজের কারুর জন্য কিছুকরতে চাইছে। বিকেলে দুরে কোথাও না গিয়ে সবাই মিলে মলে গিয়ে বিকেলটা কাটিয়ে ফিরে আসার সময় দিদান আবার কিছু কেনাকাটা করাতে, ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেছে…সবাই মিলে গরম কফি খেতে খেতে গল্প হচ্ছিল… দাদুর ছোটোবেলায় ভুত দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে। কম্বলের নিচে মৌ দিদানের গায়ে সেঁটে গিয়ে চুপ করে গল্প শুনছে…ওদিকে শুক্লাদিও গুটিসুটি মেরে চাদর গায়ে দিয়ে বসে আছে দিদানের আর এক পাশে। গরমের শেষ…বর্ষা সবে আসবে আসবে করছে …ইস্কুল থেকে ফিরে রায়েদের পোড়ো বাগান বাড়ীর পাশের মাঠে ফুটবল খেলতে খেলতে খেয়াল নেই কখন সন্ধে হয়ে এসেছে…ঝম ঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতেই দৌড়ে গিয়ে বাগান বাড়ীর লোহার গেট টপকে সবাই মিলে ভেতরে ঢুকে পড়েছি। দিনের বেলা অনেকবার আম জাম কাঁঠাল খেতে ঢুকেছি কিন্তু সেই প্রথম সন্ধের পর ঢোকা…গাড়ী বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে আছি…বৃষ্টি থামলেই বেরোবো…চারদিকের বড়বড় গাছের জন্য জায়গাটা বেশ অন্ধকার মতো হয়ে আছে…আমাদের পাড়ার হাবু ছিল একটু ভিতু টাইপের…চারদিক তাকাতে তাকাতে আমার গায়ে সেঁটে গেছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম…কি হল আবার…সরে দাঁড়া না। হাবু আমার গায়ে আরো সেঁটে গিয়ে বলল…বিশু চল…পালাই…দাদুর কাছে শুনেছি এখানে নাকি ভুত আছে। ধুস…তুই একটা ভিতুর ডিম…আসুক না ভুত…এতজন আছি…কি করবে? বলা শেষ হতে না হতেই…পেছনে রায়বাড়ির বড় কাঠের দরজায় যেন কিসের একটা আওয়াজ হল…ক্যাঁচর ক্যাঁচ। সাথে সাথে গাডী বারান্দার ছাদে দুম করে কিছু একটা ভারী কিছু পড়ার আওয়াজ…এতক্ষন ঠিক ছিল…এমনিতেই হাবুর কথা শুনে মুখে যতই বলি না কেন একটু যে ভয় লাগছিল না তা নয়…এক সাথে দুটো অদ্ভুত আওয়াজ পেয়ে বুকের ভেতরে ভয় এসে গেল… চারদিক আলো হয়ে উঠে কড়কড় করে খুব কাছে একটা বাজ পড়ল…ওই আলোতে পেছনের দিকে তাকিয়ে হাড় হিম হয়ে গেল… কি একটা বিশাল জন্তুর মতো দাঁড়িয়ে আছে…এই পর্যন্ত বলে দাদু একটু থেমেছে…আর…হটাত লোডশেডিং হয়ে গেলে ঘরের পরিবেশটা যেন আরো ভুতুড়ে হয়ে গেল…কোনো আওয়াজ নেই…সবাই চুপ…একটু পরে হোটেলের জেনারেটার চালালে আলো ফিরে এল…মৌকে দেখা যাচ্ছেনা…কম্বলের নিচে ঢুকে গিয়ে দিদানকে জড়িয়ে ধরে আছে…শুক্লাদি দিদানের আর এক দিকে আরো জড়সড় হয়ে বসে…দাদু হো হো করে হেসে ফেলে বলল…শুনেই এই অবস্থা…আর আমার মতো অবস্থায় পড়লে কি হত কে জানে…দাদুর কথা শেষ হতেই…আবার আলো চলে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড পর ফিরে এল…আলো যাওয়া আর আসার মাঝে দরজায় টক টক করে আওয়াজ হল দুবার…দাদুর হাসি শুনে মৌ চোখের নীচ পর্যন্ত মাথাটা বের করেছিল সবে…যেই ঘর অন্ধকার হওয়ার পরেই দরজায় আওয়াজ হয়েছে সাথে সাথে আবার কম্বলের তলায় ঢুকে গেল। ওদের অবস্থা দেখে অরিত্রর হাসি পেয়ে গেল…কোনো রকমে হাসি চেপে দরজাটা খুলে দিতে…এক মুখ হাসি নিয়ে পবন ঘরে ঢুকে ওদের অবস্থা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বলল…সাব…কেয়া হুয়া? লাগতা হ্যায়…সব ডর গ্যয়ে হ্যায়…

দাদু মুখটা গম্ভীর করে বলল…হাঁ…ভুত আয়া থা…আভি আভি চলে গ্যায়ে।

পবন চোখ বড় বড় করে বলল…সাচমুচ ভুত আয়া থা?

অরিত্র আর থাকতে না পেরে হেসে ফেলে বলল…মাথা খারাপ হ্যায় কেয়া? ভুত কাঁহাসে আয়েগা?

আপ জানতে নেহি সাব…ভুত হ্যায়…হামভি দেখা।

আচ্ছা ঠিক হ্যায়…দেখা তো দেখা…আভি ব্যায়ঠো…গরম কফি অউর নমকীন হ্যায়…

সাব ভাবীজীকী হাত পে এ ধাগা বাঁধ দিজিয়ে…ম্যায় খুদ নাহাকে পুজা দিয়া…সব কুছ ঠিক হো জায়েগা…

দুপুর বেলা ঠিক ছিল…ও একাই ছিল…কিন্তু এখন সবার সামনে ভাবীজী বললে…কান লাল হয়ে উঠল…কি বলবে বুঝতে না পেরে বলল…দিদান…পরিয়ে দাও না।

নেহি… নেহি…সাব…আপ খুদ…

অরিত্রর মুখের কাঁচুমাচু অবস্থা দেখে দিদান বলল…পরিয়ে দে না…কি হয়েছে…

মৌ কম্বলের নিচ থেকে মুখ বের করে বোঝার চেষ্টা করছিল কি হচ্ছে…দিদান ওকে ছোট্ট একটা আদুরে ধাক্কা দিয়ে বলল…এই মেয়ে…কি তখন থেকে কাঠবেড়ালীর মতো মুখ বের করে দেখছিস…ওঠ…

অরিত্র মৌ এর হাতে ধাগা বাঁধতে বাঁধতে এক বার চোখ তুলে তাকালো…ওর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে…দু চোখে অদ্ভুত এক ভালো লাগার ছোঁয়া…শুধু দিদান নয়…দাদু আর শুক্লাদিও ওর অবস্থা টা বুঝে ওদের দিকে না তাকিয়ে পবনের সাথে কথা বলছে দেখে চোখ পাকিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করল…সবার সামনে ওইভাবে আমাকে না দেখলেই নয়?

সারা মুখে দুষ্টুমির হাসি ভরিয়ে দিয়ে যেন জবাব দিতে চাইলো…বেশ করেছি…আরো করবো…কেন তুমি আমাকে সব সময় দুরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা কর।

রাতে খেয়ে রুমে ঢুকতেই ফোনটা বেজে উঠল, ছোড়দি ফোন করেছে দেখে তাড়াতাড়ি রিসিভ করলে…পুবালী জিজ্ঞেস করল…কি রে ভাই…রুপসার ফোন ধরছিস না কেন? তিন বার ফোন করেছে তোকে।

আমি ছিলাম না রে, খেতে গিয়েছিলাম…এখুনি করছি…এখোনো রেগে আছে নাকি রে?

না রে…ও রাগ করে থাকার মেয়ে নাকি…

ছোড়দি…তুই একটু ধর…রুপসাকে লাইনে নিচ্ছি…খুব এম্ব্যারাসাড হয়েছি আজ…বুঝলি।

কি হোলো আবার…

একটু ধর…রুপসাকে ধরি…তারপর বলছি…

দু বোনকে লাইনে নিয়ে পবনের ভাবীজী বলা আর পূজো দেবার ব্যাপারটা বলতেই রুপসা প্রায় লাফিয়ে উঠল…দেখলি তো…আমি বললেই তোর যত প্রবলেম…আর সবাই কি বলছে এখন? তোদের ওই পবন দু দিনেই বুঝে গেছে…আর তুই কিছু বুঝতে পারছিস না…বল…এবার…

হুম…বুঝলাম…তুই এবার বল…আমার উপরে আর রেগে নেই তো?

ধুস…তোর উপর রেগে থাকলে এতবার ফোন করি নাকি? একটা মাত্র দাদাভাই…রাগ করে থেকে কি করবো রে? কি রে ছোড়দি…তাই তো?

পুবালী হেসে ফেলে বলল…তাছাড়া …আবার কি…
পরের দিন মহাকাল মন্দীরে সবাই মিলে গিয়ে পূজো দেওয়ার পর আর হোটেলে না ফিরে দিনের বাকিটা এদিক ওদিক ঘুরে আসতে আসতে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল। আগের দিন শুক্লাদি আর মৌ ভুতের গল্প শুনে খুব ভয় পেয়েছিল বলে আজ ওরা চারজনে বসে লুডো খেলছে। অরিত্র পবন কে সাথে নিয়ে বাজারের দিকে গেল কিছু ঘর সাজানোর জিনিষ কিনতে…বন্ধুবান্ধব, অফিস কলিগ… সবাই কে কিছু না কিছু দিতে হয়। ফিরে এসে কিছুক্ষন গল্প গুজব করে খেয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে সাড়ে নটা বাজলো…ঠান্ডাও মোটামুটি ভালোই পড়েছে…সারাদিন বাইরে ঘুরে সবাই একটু ক্লান্তও ছিল। পরের দিন সকালে আর বেরোনো গেল না,দিদান আর শুক্লাদি দুজনেরই গায়ে অল্প জ্বর এসেছে। বোস দাদুকে ফোন করলে… কি ওষুধ খাওয়াবে বলে দিয়ে বলল…এক কাজ কর একটু করে ব্র্যান্ডি খাইয়ে দে…বিকেলের ভেতরে চাঙ্গা হয়ে উঠবে।পবন দুবার উপরে এসে ডাক্তার দেখাতে হবে কিনা খোঁজ নিয়ে গেছে। দিদানরা বেরোতে পারবে না বলে দাদু বলে দিয়েছে বেরোবে না…মৌ দিদানের পাশে বসে টিভি দেখছে…কেউ বেরোচ্ছে না বলে ওরও বেরোবার কোনো ইচ্ছে ছিল না। অরিত্র কিছু কাজ না পেয়ে নিজের রুমে গিয়ে টিভিতে গান শুনছিল…চ্যনেল ভি তে। দরজাটা খোলাই ছিল…সাড়ে দশটা নাগাদ দাদু এসে বলল…চুপচাপ বসে থেকে কি করবি…মৌ কে নিয়ে কাছাকাছি কোথাও গিয়ে ঘুরে আয় না…

কোথায় যাবো? দিদান দের জ্বর।

সামান্য জ্বর…ও নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই…আমি তো আছিই…তোরা ঘুরে আয়। মৌ কে বলেছি…তুই গেলে ও যেতে রাজী আছে।

পবন হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আরো কয়েক জনের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল, ওরা দুজনে বেরোতেই দৌড়ে এসে বলল…সাব…কাঁহা যানা হ্যায়?

চলো…নজদিক থোড়া ঘুমকে আতে হ্যায়।

কিছুটা যাবার পর রাস্তার একদিকে চায়ের বাগান আর একদিকে পাহাড় …এক জায়গায় রাস্তার বাঁকে একটা ছোটো ঝরনার মতো…অনেকটা উপর থেকে সরু জলের ধারা নেমে আসছে…মৌ খুব মন দিয়ে জায়গাটা দেখছে দেখে অরিত্র গাড়ী দাঁড় করালো…দুজনে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছিল…খুব সুন্দর জায়গাটা…রাস্তার উল্টো দিকের ঢালে চায়ের ছোটো ছোটো গাছ…হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে…আর এদিকে ঝরনা। পবন গাড়ী থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে এসে বলল…সাব ফোটো লিজিয়ে না…

মৌকে ঝরনার দিকে দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন পোজে কয়েকটা ফটো তোলার পর পবন নিজেই এগিয়ে এসে বলল…সাব…আপ ভাবীজী কী পাশ যাইয়ে…আপ দোনো কা সাথ সাথ মে ফোটো বহুত আচ্ছা আয়েগা…

নিকন ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা…শুধু শাটার টিপলেই হবে না…পবন তুলতে পারবে কি পারবে না ভেবে মৌকে উলটো দিকে দাঁড় করিয়ে সব কিছু সেট করে নিয়ে পবন কে দেখিয়ে দিল কি করতে হবে…পবন ক্যামেরাটা নিয়ে দাঁড়ালে অরিত্র রাস্তা পেরিয়ে মৌ এর পাশে গিয়ে ইশারা করলো শাটার টিপতে…ওর দাঁড়ানো পবনের পছন্দ হল না…হাত নাড়িয়ে ইশারা করছিল ওদের দুজনকে আরো কাছাকাছি আসতে। আরো একটু কাছাকাছি এলেও পবন ইসারা করছিল…আরো কাছাকাছি। কি বিপদে পড়া গেছে ভেবে মৌ এর দিকে তাকালো…নির্বিকার মুখে চা বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে…ভাবখানা যেন এই…ঠিক হয়েছে…আমি এত চেয়েছি…তবু কাছে আসোনি…এখন বোঝো…কি করবে। ধ্যাত তেরি কি…জড়িয়ে ধরে দাঁড়াই…ভেবে…ওর একেবারে পাশে এসে এক হাত দিয়ে কোমর জড়িয়ে ধরে দাঁড়ালে পবন হাত তুলে ইশারা করল…এবার ঠিক আছে। পবন বোধহয় ইচ্ছে করেই একটু বেশি সময় নিচ্ছিল শাটার টিপতে কিন্তু কিছু করার নেই…মৌ এর এত কাছে কোনোদিন আসেনি…ভীষন ভালো লাগছিল…ওকে এত কাছে পেয়ে…ওর শরীরের মেয়েলী গন্ধে মন মাতাল হয়ে যেতে চাইছিল। পবন হাত তুলে জানালো হয়ে গেছে…তার পরেই বলল…সাব অউর এক…আপলোগ ইধার আইয়ে…ম্যায় উস তরফসে খিচেঙ্গে।

মৌকে সাথে করে রাস্তা পেরিয়ে চা গাছের পাশে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ফিরে গেল ক্যামেরাটা সেট করতে…ওদিকে গাছের ছায়া থাকায় আলো কম ছিল…এদিকে অনেকটাই ঝকঝকে আলো আছে…আগের মতো তুললে হবে না…মৌ একটা চা গাছ ছুঁয়েহাসি মুখে দাঁড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে…ক্যামেরার লেন্স দিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লোজ আপে নিয়ে এসে দেখছিল…কি সুন্দর সারল্য মাখানো মুখ…কোথাও কোনো মালিন্য নেই…ক্যামেরাটা সেট করে পবনের হাতে দিয়ে রাস্তা পেরোতে গেল…এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল যে খেয়াল করেনি যে ও একটা রাস্তা পেরোতে যাচ্ছে। হটাত একটা ভীষন কর্কশ আওয়াজ কানে এল…সাথে সাথে কেউ যেন ওকে এক ঝটকায় টেনে ধরল। কয়েক সেকেন্ড মাথাটা পুরো যেন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল…সম্বিত ফিরে এলে কি হতে যাচ্ছিল ভেবে সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল… রাস্তার মাঝখানে একটা টাটা সুমো দাঁড়িয়ে আছে…ডাইভার গালাগালি দিতে যাচ্ছিল…পবনকে দেখে গালাগালি না দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এসে জিজ্ঞেস করল…কোথাও লেগেছে কিনা।

কিছু হয়নি…খুব ভুল হয়ে গেছে…একেবারে খেয়াল করিনি বলার পর মনে পড়ল…ওদিকে মৌ একা দাঁড়িয়ে আছে…ভয় পেয়ে যায় নি তো? ওর আবার টেনশান হলে চলবে না…ভেবে…তাড়াতাড়ি গাড়ীটার পেছন দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে ঘাবড়ে গেল…মৌ চা গাছটার পাশে হাঁটু মুড়ে মুখ নিচু করে বসে আছে …সারা শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে…আরো কাছে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ওকে ডাকতে গিয়ে ওর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পেয়ে অবাক হয়ে গেল।এর আগে একবার কাঁদতে দেখেছে কিন্তু গলায় তো কোনো আওয়াজ ছিল না। আর কিছু ভাবার সময় ছিলনা…তাড়াতাড়ি ওর কাঁধে দু হাত রেখে ডাকলো…এই…মৌ…এই তো আমি…কিছু হয়নি আমার…ওঠো…

নিজের কানকেই বোধ হয় বিশ্বাস করতে পারছিল না ও…আস্তে আস্তে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে… কান্না যেন আরো বেড়ে গেল…অরিত্র দু হাতে ধরে তোলার চেষ্টা করলে নিজেই উঠে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকলো…কান্না কিছুতেই থামছে না দেখে…অরিত্র আবার বলল…এই…আমি ঠিক আছি… দেখো…আমার কিছু হয়নি…

বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে কান্না ভেজা গলায় বলল…আমার চাই না ফটো…তুমি কেন ওদিকে একা গেলে?

নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না অরিত্র…মৌ কথা বলছে…স্বপ্ন দেখছে না তো? ওর মাথা নিজের বুকে আরো নিবীড় ভাবে চেপে ধরে মুখ নামিয়ে বলল…তোমাকে একা রেখে আমি আর কোথাও যাবো না…

আর কোথাও যাওয়ার কোনো প্রশ্ন ছিল না…সবাই কে জানাবার জন্য মনটা ভীষন ছটপট করছিল…নিজের ফোনটা আনতে ভুলে গিয়েছিল…পবনের ফোন থেকে যে দাদুকে ফোন করবে তার উপায় নেই…দাদুর নাম্বারটা মোবাইলে সেভ করা থাকে বলে মনে থাকে না …পবন সাবধানে গাড়ী চালাতে চালাতে বকবক করে যাচ্ছে…ও যে বলেছিল পূজো দিলেই কাজ হবে। মৌ ওর পাশে বসে কাঁধে মাথা রেখে কোলের উপরে অরিত্রর হাতটা ধরে চুপ করে চোখ বুজে বসে আছে পরম নিশ্চিন্তে…

হোটেলের সামনে পৌঁছোতেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নেমে মৌ এর হাত ধরে প্রায় দৌড়ে দাদুর রুমে গিয়ে পৌঁছোলে সবাই ওদেরকে ওইভাবে আসতে দেখে বুঝতে পারছিল না কি হয়েছে…কোনো রকমে হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে পারল…মৌ…

আর কিছু বলতে পারছে না দেখে দাদু ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল…কি হয়েছে…এত হাঁপাচ্ছিস কেন…

অরিত্র একটু দম নিয়ে বলতে পারল…কথা বলেছে।

কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না ওর কথা…দিদান ততক্ষনে উঠে এসেছে…মৌ দিদান কে জড়িয়ে ধরলে দিদান ওর মুখটা তুলে ধরে বলল…এই মৌ…সত্যি?

মৌ অস্ফুট স্বরে বলল …দিদান…

শুক্লাদি আর দাদুও ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল…কেউই বিশ্বাস করতে পারছিল না…দিদান নিজের চোখের জল আটকাতে পারলো না…ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে ওকে কিভাবে আদর করবে যেন বুঝতে পারছিল না। দিদানের চোখের জল আস্তে আস্তে যেন বাকিদের চোখেও জল এনে দিল…

পবন প্রায় লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকে ওদের অবস্থা দেখে থমকে দাঁড়ালো…হাতে বেশ বড় একটা মিষ্টির প্যকেট…সবার চোখে জল দেখে ওর চোখেও জল এসে গেছে…চোখের জল নিজেই মুছে নিয়ে একটা মিষ্টি মৌ এর মুখে দিয়ে…বলল…আজ ম্যায় বহুত খুশ হঁ…মেরা বহেন ঠিক হো গ্যায়ি। দিদান ওকে ছেড়ে দিয়ে বলল…যা…নিজের হাতে সবাই কে খাইয়ে দে। সবার আগে পবনকে খাইয়ে তারপর সবাই কে এক এক করে খাইয়ে অরিত্রর কাছে এলে…অরিত্র মুখটা গম্ভীর করে বলল…আমার দুটো চাই।

তখোনো মুখের কান্না কান্না ভাবটা যায়নি…তার ভেতরেই মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে বলল…কেন?

বা রে…আমিই তো তোমার কথা প্রথম শুনেছি…তাই না?
উমম…এখন পাবে না…পরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

1PlvD_17050_9aeadabd8172e574de598c611e410eed

Amar ma khub sexy

Eta amar jiboner shob cheye shorinio ghotona. Amar ma khub sexy. Mar boysh 45 bosor. ...